নতুন চেয়ারম্যান

গাড়ী চলছে ব্যাঙ্কের হেড অফিসের দিকে, পিছনের সীটে বসে সিং সাহেব সংবাদ পত্র উঠিয়ে নিলেন। কিন্তু কোন সংবাদেই ওনার উৎসাহ নেই যেন। নামিয়ে রাখলেন সংবাদ পত্র। ইন্টারভ্যু তো  ভালোই হয়েছে মনে হচ্ছে। সিফারিস ঠিক সময় মতন পৌঁছেও গিয়েছে। এবার চেয়ারম্যান হবার সুযোগ মনে হয় 50:50। দুই-একদিনের মধ্যেই জানা যাবে কি হোল। এই সব নানা চিন্তা করতে করতে সিং সাহেব কখন যে লিফটে চড়ে নিজের অফিসের ফ্লোরে পৌঁছে গেছেন সেটা বুঝলেন যখন ওনার পিএ তাকে “গুড মর্নিং” বলে।

তাড়াতাড়ি নিজের চেম্বারে গিয়ে ঢুকলেন। চেম্বারে আছে এক বিশাল টেবিল আর তার উপরে একটা কাঁচ রাখা আছে – গ্লাস-টপ। সেই কাঁচের নীচে একটি মন্দিরের ছবি আছে। হাত ঠেকিয়ে সেই মন্দিরকে তিনবার প্রণাম করলেন আর নিজের সিংহাসনে বিরাজমান হলেন। পিএকে চা পাঠাবার জন্য বলে ফাইলগুলোর মধ্যে থেকে একটা ফাইল তুলে পড়তে লাগলেন। একটা কোম্পানির লোনের ফাইল। তিন মাসের জন্য অস্থায়ী ওভারড্রাফট চায়। “শালারা চাইলো তো কি চাইলো” বলে ফাইলের নীচে সহি করে চেয়ারম্যানের উদ্দেশে পাঠিয়ে দিলো। দ্বিতীয় ফাইলটি তুলে পড়তে শুরু করলেন। এমন সময় মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো। নতুন নম্বর।

— হ্যালো

— সিং সাহেব?

— জী

— আমি বিত্ত মন্ত্রালয় থেকে মন্ত্রীজীর পিএ বলছি।

— জী, জী আদেশ করুন। (মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত অনভুতি হচ্ছে। বেশ খুশি খুশি মনে হচ্ছে। মন্দিরকে আবার ডান হাত দিয়ে ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। একটা পেন্সিল আর নোটবুকটা টেনে নিলেন কাছে, যদি কিছু লিখতে হয়।

— মন্ত্রীজী আপনাকে স্মরণ করছিলেন। আপনি পৌনে বারোটায় ঠিক পৌঁছে যাবেন। ঠিক আছে তো?

— ঠিক আছে স্যার, আমি ঠিক পৌঁছে যাবো সময় মতো।

সিং সাহেবের মন উল্লাসে ভরে গেলো। মাথা টেবিলে ঠেকিয়ে মন্দিরে আবার প্রণাম করলেন। দুই মিনিট শান্ত হয়ে বসে পড়লেন নিজের চেয়ারে। মনে মনে তৈরি হয়ে নিলেন মন্ত্রীজী ব্যাঙ্কের ব্যাপারে কি জিজ্ঞাসা করতে পারেন তার উত্তর, আগে তার কোথায় পোস্টিং হবে ইত্যাদি। সময় হাতে বেশী নেই। মন্ত্রীজীর সাথে দেখা করতে হবে সাথে কিছু নিয়ে যেতে হয়। একটা পুষ্পস্তবক তো সর্বপ্রথমে প্রয়োজন। আর কি গিফট? সময়ও নেই এখন গিফট কেনার। এই চিন্তা করতে করতে ঠিক করলেন পথে কনট প্লেস থেকে একটা ভালো গোল্ডেন পেন নিয়ে নেবেন। তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। আগে প্রীতিকে খবরটা দি। প্রীতি সিং সাহেবের পিএ।

— হ্যালো প্রীতি, মনে হচ্ছে এবার হয়ে যাবে। মন্ত্রীজী তলব করেছেন। এখনো কাউকে কিছু বোলোনা। আমি ফিরে আসি আগে। একটু ড্রাইভারকে বল গাড়ীটা গেটের কাছে নিয়ে আসতে। বাই।

তারপরে সোজা গেলেন চেয়ারম্যানের ঘরে। দরজা খুলে ঢুকেই প্রথমে হাত জোড় করে দণ্ডবৎ প্রণাম করলেন আর আশীর্বাদ চাইলেন।

— আচ্ছা তো এবার কাজটা তাহলে হয়েই যাচ্ছে। ঠিক আছে। দেখা করে ফিরে আসো তারপরে পার্টি হবে। গুড লাক!

পথে কনট প্লেস থেকে গোল্ডেন পেনের একটা সেট কিনলেন আর কিনলেন পুষ্পস্তবক। তারপরে সোজা গেলেন মন্ত্রালয়। সময় মতন পৌঁছে গেলেন। পৌনে বারোটায় ঢুকলেন মন্ত্রীজীর ঘরে। সোজা গিয়ে মন্ত্রীজীর হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম জানালেন। পুষ্পস্তবক আর পেন সেটা  রেখে দিলেন মন্ত্রীজীর টেবিলে। মন্ত্রীজী দেখলেনও না ঐদিকে।

— আরে সিং তোমার কাজের অনেক প্রশংসা শুনেছি। ভাবছি তোমাকে প্রোমট করে তোমার ঘাড়ে আরও কাজের ভার চাপিয়ে দেবো।

— হেঁ হেঁ স্যার যেরকম আপনার আদেশ। আমি তো সব সময় প্রস্তুত।

— আমার সাথে যদি কোন কোথা বোলতে হয়, বা আমার যদি কিছু বলার থাকে তাহলে সতীশকে বলে দেবো। সতীশের মোবাইল নম্বরটা নিয়ে নাও। এক-আধ দিনের মধ্যে তোমার সাথে দেখা করে নেবে। জনগণের সামনে সবসময় মন্ত্রালয়ের প্রশংসা করবে। আর দেখো যেন অকারণে কোন হড়তাল, ধর্মঘট যেন না হয়। তোমার চিঠি এঁরা তোমার অফিসে ফ্যাক্স করে দেব। এখন যাও।

সিং সাহেব তাড়াতাড়ি নতমস্তকে প্রণাম করে বেড়িয়ে এলেন ঘর থেকে। পিএকে নমস্কার করে হাত মেলালেন। পিএ সিং সাহেবকে অভিনন্দন জানালেন।

— Congratulations সিং সাহেব! আপনি মেট্রো ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান হয়ে গেছেন। আমাদেরও একটু খেয়াল রাখবেন।

— হেঁ হেঁ, আপনার দয়া। চিঠিতো বিকেলের মধ্যে পাঠিয়ে দেবেন আপনারা?

— স্যার, চিঠিতো তৈরি আছে। আমাদের সাথে বসে এক কাপ চা খান। ততক্ষণে আপনার পুরানো অফিসে আর অন্য সর্বত্র ফ্যাক্স করিয়ে দিচ্ছি। এখান থেকে যাবার আগে একটু ব্যাঙ্কিং বিভাগ হয়ে যাবেন। ওরা আপনাকে একটু ব্রিফিং করে দেবে।

— ঠিক আছে। আমি ব্যাংকিং বিভাগের সেক্রেটারি সাহেবকে ফোন করে দিচ্ছি। ততক্ষণ আপনারা অফিশিয়াল কাজ সারুন। চা তো আসছে। আপনার সাথে চা খাই আগে।

ব্যাঙ্কিং বিভাগের থেকে নানা খবর এবং তথ্য পেলেন। সাথে সাথে নতুন ব্যাঙ্কের জন্য রণকৌশল চিন্তা করতে থাকলেন।

মন্ত্রালয় থেকে বেড়িয়ে প্রথম কাজ নোট করে নিলেন — পিএ সাহেবের ঘরে মিষ্টি পাঠাতে হবে। প্রীতিকে মুম্বাই যাবার জন্য প্রস্তুত হবার কথা বোলতে হবে। তারপরে চেয়ারম্যান সাহেব কে ফোন করলেন,

— হ্যালো, স্যার!

— আরে ভাই সিং তুমি তো মুম্বাই যাচ্ছো, মেট্রো ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান হয়ে। তোমার তো ফ্যাক্স এসে গেছে অফিসে। তাড়াতাড়ি আসো, পার্টি করতে হবে।

পার্টির যেন বন্যা লেগে গেছে। ইউনিয়নের নেতারাও এসে দেখা করে গেলো। নতুন, পুরানো ব্যাঙ্কের সব কর্মীরা, পার্টিরা সব মেসেজ পাঠাচ্ছে। মোবাইল ফোন যেন কানের থেকে সরছেনা।

— স্যার আপনার তো হবার ছিলই।

— স্যার, আমরা আপনাকে খুব মিস করবো।

— আপনি খুব কর্মঠ অফিসার, আপনাকে মনে থাকবে।

এই সব নানা রকমের মেসেজ এসেই যাচ্ছে।

সিং সাহেব হেঁ হেঁ করতে করতে পার্টিদের থেকে পাওয়া গিফটগুলো একত্র করে নিলেন আর সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন। নতুন ব্যাঙ্কের জেনেরাল ম্যানেজাররাও ফোন করে ছিলেন। ওনাদের থেকে গেলো বছরের ব্যালেন্স শিট ইমেইল করিয়ে নিয়েছেন। নতুন ব্যাঙ্কে যাবার আগে একটু ধারণা হয়ে যাবে। অবশ্য ব্যাঙ্কিং বিভাগ থেকেও কিছু ধারণা পাওয়া গেছে।

আগামী সোমবারে সিং সাহেব নতুন ব্যাঙ্কে যাচ্ছেন। ওনার জন্য একটা পাঁচ-তারা হোটেলে ঘর বুক করা হয়ে গিয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসার ব্যাবস্থা হয়ে গিয়েছে। নতুন ব্যাঙ্ক ওনাকে স্বাগত জানাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বাঙ্কিং বিভাগকে ফ্যাক্স করে দেওয়া হয়েছে উনি আগামী সোমবার নতুন ব্যাঙ্কের কার্য্যভার গ্রহণ করছেন।

সোমবার থেকে সিং সাহেব নতুন চেয়ারম্যান হয়ে গেলেন।

I'd love to hear your thoughts on this post! Please leave a comment below and let's discuss.