মা মৌলীক্ষা মন্দির

ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ছোটনাগপুর মালভূমির পশ্চিম দিকে দুমকা শহরের নিকটে অবস্থিত ছায়া সুনিবীড় স্নিগ্ধ গ্রাম সিদ্ধপীঠ মন্দিরময় গ্রাম মলুটি। এখানেই বিরাজিতা মা মৌলীক্ষা। মৌলী কথার অর্থ মস্তক আর ইক্ষা দর্শন।

নানকার তালুকের অন্তর্গত এই গ্রাম। নানকার রাজ্যের রাজধানী ছিল মলুটি। তবে নানকার তালুক গঠিত হয়েছে পাঁচশো বছর আগে গৌড়েশ্বর নবাব আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র সময়। কিন্তু মা মৌলীক্ষার মন্দির অনেক আগের। রাজারা এখানে রাজধানী স্থাপনের পর মা মৌলীক্ষাকে তাঁদের কুলদেবী সিংহবাহিনীরূপে পূজা করছেন; কিন্তু তার আগে তিনি ছিলেন বৌদ্ধতান্ত্রিদের পূজিতাদেবী।

ঝাড়খণ্ডের এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এইখানে বৌদ্ধ ব্রজযান সম্প্রদায়ের তান্ত্রিকগণ তাঁদের পঞ্চধ্যানীবুদ্ধের মধ্যে অমিতাভ শক্তি পাণ্ডরার পুজো করতে থাকেন। বিশ্বসৃষ্টির মূলে বৌদ্ধরা পাঁচটি স্কন্ধকে মেনে নিয়েছেন – রূপ, বেদনা, সংঞ্জা, সংস্কার ও বিঞ্জান। পাঁচটা স্কন্ধের পাঁচজন ধ্যানীবুদ্ধ আছেন। তারা হলেন বৈরোচন, রত্নসম্ভব, অমিতাভ, অমোঘসিদ্ধি এবং অক্ষোভ্য। প্রত্যেক ধ্যানীবুদ্ধের আবার এক বা একাধিক শক্তি আছে তারা হলেন যথাক্রমে লোচনা মতান্তরে মামকী, বজ্রধাত্বীশ্বরী মতান্তরে তারা, পাণ্ডরা, তারা মতান্তরে বজ্রধাত্বীশ্বরী এবং সর্বশেষ মানসিকা মতান্তরে লোচনা।

দেবী মৌলীক্ষা হলেন অমিতাভ শক্তি পাণ্ডরার রূপ। প্রত্যেক ধ্যানীবুদ্ধের পৃথককুল আছে। পাণ্ডরার যে রূপবর্ননা আছে তা হল গাত্রবর্ণ লাল, বাহন ময়ূর, প্রতীক পদ্ম এবং দেবী পশ্চিমমুখাসীন। সেই হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে মৌলীক্ষা মূর্তির সাথে। সেইজন্য অমিতাভশক্তি পাণ্ডরাই বর্তমান মৌলীক্ষা মা’র রূপ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য অমোঘসিদ্ধি শক্তি তারার সাথে তারাপীঠে দেবী তারার সাদৃশ্য রয়েছে। নানকারের রাজারা এখানে রাজ্যত্ব পাওয়ার বহু আগেই সেইসব বৌদ্ধতান্ত্রিক এই স্থান ছেড়ে চলে যান।

নানকার তালুকের প্রথম রাজা হলেন রাজা বাজবসন্ত তিনি ছিলেন অতিদরিদ্র এক রাখাল অন্যের বাড়িতে কাজকরতেন। কিন্তু রাখাল থেকে রাজা হওয়ার কাহিনীটিও অনবদ্য যার পিছনে কাশীর সুমেরুমঠের দণ্ডীস্বামীরও ভূমিকা আছে। বসন্তরাখাল একদিন গোচারন অন্তে এক গাছের তলায় ঘুমিয়ে পড়েন। পড়ন্তবিকেলে তার মুখে রোদ পড়ছিল এক সাপ তা রোধ করছিল ফণা দিয়ে সেই সময় সেই পথ দিয়েই তীর্থে যাচ্ছিলেন দণ্ডীস্বামী নিগমানন্দ তীর্থ মহারাজ। তিনি এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। তিনি তাকে ডেকে সব জিজ্ঞাসা করেন। তিনি দেখেই বোঝেন এ ছেলের রাজযোগ আছে কিন্তু সে রাখালের কাজ কেন করছে তা বুঝতে পারেননি। পরে তিনি তার মার কাছে যান এবং সবটাই বুঝে যান যে তার ইষ্টমন্ত্রে অক্ষর ভুল আছে এবং সেই ভুলই সে জপ করছে। তখন তাঁদের কুলগুরুকে গিয়ে সব বলে তিনি মন্ত্র শুদ্ধ করে দিতে বলেন কিন্তু তিনি তা অস্বীকার করলে মন্ত্র জলে ভাসিয়ে তিনিই তাকে শুদ্ধ মন্ত্রদান করেন।

তার ঠিক চারদিনের মাথায় সফররত আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বেগমের বাজপাখি হারিয়ে যায় এবং তাতে রাজা পুরস্কার ঘোষনা করেন। আর ঘটনাক্রমে সেই পাখি ফাটলে ধরেন রাখাল বসন্তই। তখন তীর্থমহারাজজি ফিরে এসে তাঁকে গিয়ে নবাবের কাছে গিয়ে বাজ ফেরত দিয়ে নিষ্কর ভূমি লাভ করিয়ে দেন বসন্তকে। নানকার শব্দটি এসেছে এই নিষ্কর কথাটি থেকেই। এরপর তাঁকে নবাব রাজা বলে স্বীকৃতিদেন বিনাকরে। তখন থেকে কাশীর সুমেরু মঠের সন্ন্যসীগণ এই রাজপরিবারের কুলগুরু হন এবং রাজার নাম হয় বাজবসন্ত।

পরবর্তীতে তা মহুলটি বা মলুটিতে রাজধানী স্থাপন করেন। এখানে মহুয়াগাছের বন ছিল বলেই নাম মহুলটি। রাজা বাজবসন্ত এবং তাঁর পরবর্তী রাজাগণ এই রাজধানীতে নিজেদের বাসস্থানের জন্য কোন বিলাসবহুল গৃহ নির্মাণ না করলেও দেবতার বাসস্থানের জন্য বহু মন্দির নির্মান করেছিলেন সেই সংখ্যা শতাধিক কিন্তু বর্তমানে আশিটি মন্দির দাঁড়িয়ে আছে। তবে বেশিরভাগটাই শিব মন্দির। আর কুলদেবী মৌলীক্ষার মন্দির।

এখানে সাধনা করেছেন বহু বিশিষ্ট সাধকগণ তার মধ্যে সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য্য এবং বামদেব প্রধান। সাধক বামদেব বালক বয়সে এখানে এক সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে নারায়নের সেবার জন্য এসেছিলেন তখনই তিনি এখানে সিদ্ধিলাভ করেন। তারা সিদ্ধির আগেই তিনি এখানে সিদ্ধ হন। মৌলীক্ষা মন্দিরে বামদেবের যে সাধনা কক্ষটি রয়েছে সেখানেতে বামদেবের ত্রিশূল ও বামদেব ব্যবহৃত বৃহৎ শঙ্খটি আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে চলেছে।

গ্রামের স্থানীয় মানুষ মৌলীক্ষা মাকে ছোটোবোন এবং তারা মাকে বড়োবোনও বলে ডাকেন। দেবী মৌলীক্ষা হলেন শান্তরূপা উদাসিনী ভক্তের আকুলতায় তিনি সাড়াদেন। তিনি উগ্রতা একেবারেই পছন্দ করেন না; উগ্রসাধককে তিনি বিতাড়িত করেছেন। এই আজও নানারকম অলৌকিকতার সাক্ষী। গর্ভগৃহে উজ্জ্বল হয়ে বিরাজমান মা মৌলীক্ষা দর্শনমাত্রেই বড় আনন্দ হয়।

জয় মা মৌলীক্ষা!

I'd love to hear your thoughts on this post! Please leave a comment below and let's discuss.