হেমন্তের শুক্লানবমীতে বঙ্গদেশে জগদ্ধাত্রী দুর্গার আরাধনা হয়। হেমন্ত কালে তাঁর আরাধনা হয় বলে তিনি হৈমন্তিকা নামেও পরিচিত। বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা বললেই চন্দননগর আর কৃষ্ণনগর এই দুটি জায়গার কথা একসাথে উচ্চারিত হয়। বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলনের সাথে জড়িয়ে আছে চন্দননগর ও কৃষ্ণনগর। কীভাবে শুরু হল এই দেবীর আরাধনা! বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন নিয়ে বেশকিছু মত প্রচলিত আছে। তার মধ্যে অন্যতম হল একবার নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের উপর বিশাল অঙ্কের কর দাবি করেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। মহারাজ সেই বিশাল অঙ্কের কর জমা দিতে অসমর্থ হন। তখন নবাব তাঁকে কারাগারে বন্দি করেন।
বেশ কিছুদিন বন্দি থাকার পর মহারাজ কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি জলপথে কৃষ্ণনগরের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। জলপথে আসার সময় তিনি দেখেন দূরে বিজয়ার বাদ্যি বাজছে। ঘাটে ঘাটে চলছে মা দুর্গার বিসর্জন। সেই দৃশ্য দেখে মহারাজ বিমর্ষ হয়ে যান। তিনি রাজবাড়ির মা রাজরাজেশ্বরীকে দর্শন করতে না পেরে মনোকষ্ট নিয়েই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। সেইসময় মহারাজার স্বপ্নে আসেন এক রক্তবর্ণা চতুর্ভুজা কুমারী নারীমূর্তি। তিনি মহারাজাকে স্বপ্নে বলেন যে আজ থেকে ঠিক একমাস পরে কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে তাঁর পুজো করতে। যে রূপে তিনি দর্শন দিয়েছিলেন রাজবাড়িতে ফিরে সেই রূপেই দেবী জগদ্ধাত্রীর পুজো শুরু করলেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী দ্রুতগতিসম্পন্ন ঘোড়ামুখী সিংহের উপর আরূঢ়া। এখানে দেবী যোদ্ধার বেশে সজ্জিতা।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর কৃষ্ণনগরের রাজবাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হওয়ার পর তাঁর প্রজারাও জগদ্ধাত্রী কৃষ্ণনগরের দিকে দিকে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা করলেন। এভাবেই কৃষ্ণনগর জুড়ে শুরু হল জগদ্ধাত্রী পুজো। এরমধ্যে বেশকিছু প্রাচীন পুজোর নাম উল্লেখ করতে হয়! চাষাপাড়া বারোয়ারীর বুড়ি মা, মালোপাড়া বারোয়ারীর মা জলেশ্বরী, তাঁতিপাড়ায় বড় মা প্রভৃতি। এই পুজোগুলো তৎকালীন সময়ে রাজপরিবারের বদান্যতায় শুরু হয়েছিল। কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো কেবলমাত্র নবমী তিথিতেই হয়।
এবার আসি চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর কথায়। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তক হলেন ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। জানা যায়, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ ইন্দ্রনারায়ণ ছিলেন চন্দননগরের ফরাসি সরকারের দেওয়ান। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো দেখে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্রনারায়ণ চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টিতে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেছিলেন। ওনার প্রতিষ্ঠিত পুজো চন্দননগরে আদি পূজা নামে পরিচিত। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল সনাতনরীতির প্রতিমায় সাদা সিংহ এবং বিপরীতমুখী অবস্থানে হাতি। স্থানীয় বিশ্বাসে এই দেবী অত্যন্ত জাগ্রতা। সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী দিবসত্রয়ব্যাপী হয় চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো। এখানকার আর এক বৈশিষ্ট্য হল বিশাল উচ্চতার প্রতিমা আর আলোকসজ্জা। এবং এরই সঙ্গে বিসর্জনের শোভাযাত্রাটিও দেখবার মতো। মনে করা হয় চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর মধ্যে দিয়েই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে জগদ্ধাত্রীর আরাধনা।
ভদ্রেশ্বরের গৌরহাটী তেঁতুলতলার মা জগদ্ধাত্রী বাংলার অন্যতম প্রাচীন জগদ্ধাত্রী পুজো গুলির মধ্যে একটি। এখানে নবমী তিথিতে মহাসমারোহে দেবীর আরাধনা হয়। এই দেবী বুড়ি মা নামে পরিচিত। এখনও ছাগ বলিদানের প্রথা বজায় আছে এখানে।
বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্ৰামে জগৎজননী শ্রীমা সারদার জন্ম ভিটেতে বহু প্রাচীন জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। বর্তমানে জয়রামবাটী মাতৃমন্দিরে এই পুজোর আয়োজন করা হয়।
হাওড়া জেলার জগৎবল্লভপুরের মায়তাপুকুরের বালি গ্ৰামে ওঙ্কার মাতৃধাম মঠে জগদ্ধাত্রী মাতার মহাপূজা ও মহোৎসব বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেবী এখানে স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠিতা। সারাবছর তাঁর আরাধনা হলেও জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন বিশেষ পুজো এবং একশত আট কুমারী পুজো হয়ে থাকে।
নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মাধ্যমেই দেবীর বঙ্গদেশে পূজা প্রচলিত হয়েছিল। কৃষ্ণনগর ও চন্দননগর ‘দেবী জগদ্ধাত্রীর শহর’ হলেও গোটা বাংলা জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন জমিদার বাড়ি, বনেদি বাড়ি, সর্বজনীন মন্দিরে দেবীর আরাধনা হচ্ছে। স্বভাবতই উৎসবপ্রাণ বাঙালি দেবী জগদ্ধাত্রীর আরাধনা নিয়েও মহোৎসবে মেতে ওঠেন।
তথ্যঋণঃ Fans of Durga Puja
