সস্তা

“এই নিন দাদু ২১০০০ টাকা।”

“আগের বারে ২৩২৫০ দিলে যে?”

“আরে দাদু সুদ কমেছে খবর রাখেননি? সব জিনিসের দাম কমে যাচ্ছে আর অত টাকা সুদ পাবেন কি করে?”

৭১ বছর বয়সী ভুবনবাবু কাউণ্টার থেকে টাকা গুলো নিয়ে কাঁপা হাতে গুনে নিলেন। নতুন করে মেয়াদি জমা করে  টাকা কম পেয়ে বেশ চিন্তিত। ত্রৈমাসিক ২১০০০ মানে মাসে ৭০০০ টাকায় গুজরান করতে হবে। ১০ লাখ টাকার মেয়াদি জমায়ে ভুবনবাবু আর তার স্ত্রীর সংসার চলে। বাকি ২ লাখ রোগ ভোগের জন্য রাখা। একদা বেসরকারি চাকুরে ভুবনবাবুর সারা জীবনের দুরুহ সঞ্চয় ১২ লাখ। একমাত্র ছেলে বিদেশে স্থিত আর সংসারী নিজের মত।

“দাদু তাড়াতাড়ি করুন লোক দাঁড়িয়ে পেছনে। আর এরপর এটিএম থেকে টাকা তুলবেন নইলে পয়সা কাটবে।”

ক্যাশিয়ারের তাড়ায় তড়িঘড়ি ব্যাংক থেকে বেড়িয়ে এলেন। ৭১ বছরের ভুবন এটিএম-পেটিএম শুনেছেন বটে তবে ব্যাবহারে অক্ষম, কিছুটা ইচ্ছেতেই। মাসে ৭৫০ টাকা কম, কোন খরচা টা ছাঁটবেন ভাবতে ভাবতে নেমে যাওয়া চশমাটা টেনে তুললেন। তার আর স্ত্রী কল্যাণীর ওষুধ খরচাই মাসে তিন হাজার টাকা।

বাজার করবেন আজ ভুবনবাবু। কল্যাণীর রক্তাল্পতা,  মাছ আর ফল কিনতে পারলে ভালো। মাছ বাজারে বিশেষ  আনাগোনা নেই, তবে আশার কথা দাম নাকি কমছে। ধীর পায়ে মাছ বাজারে ঢুকে সাহস করে দোকানীকে শুধোলেন — “কাটা পোনা কত?”

“৩৫০ ওইটা ৪০০ এদিকেরটা। অবজ্ঞা ভরে ব্যাস্ত দোকানী বলল।”

বাপরে, অবাক হলেন ভুবনবাবু। শেষ যেবার এসেছিলেন তখন ছিল ৩০০। দাম তো কমার কথা। ইতস্তত করে বললেন “কিছু কম টম …”

“যান দাদু লোটে খান, এইসব মাছ কম নেই।”

“আমাকে তিন কিলো গাদা পেটি  মিলিয়ে দে। পাশে দাঁড়ানো বারমুডা পড়া ছোকরা বলল লম্বা সাদা সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে।”

গুটি পায়ে ফিরতে গিয়েও কল্যাণীর কথা ভেবে ১০০ টাকা দিয়ে ২৫০ মাছ কিনলেন, ৩ টুকরোতে তিন দিন হবে। অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হল ছোট খদ্দের বলে, আঁশ টাও ছাড়াল না।

মাছ নিয়ে রঘুর ফলের দোকানে গেলেন। ওর থেকে মাঝে মধ্যে পুরনো হয়ে যাওয়া ফল কেনেন কিছু সস্তায় — ঠিক পচাও না আবার ভালোও না। কিন্তু  আজ ইচ্ছে আছে একটু ভালো আপেল কেনার। ডাক্তার কল্যাণীকে খেতে বলেছে।

“রঘু আপেল কত রে বাবা, ওই স্টিকার মারা স্যান্ডো পড়া আপেল গুলো।”

“২২০ দাদু। তা তুমি আজ ওটা জিগ্যেস করছ? পাকা পেয়ারা নিয়ে যাও দুটো ১০।

বাপরে! দুমাস আগে আপেল কিনেছিলেন ১৫০ টাকা কিলো। তবে যে ব্যাংকে বলল —

কি আর করা, ৬৬ টাকা দিয়ে দুটো আপেল কিনলেন।

এরপর চালের দোকান, মুদির দোকান, সব্জির দোকান কোথাও গিয়েই ভুবনবাবু ব্যাংকারের কথা মেলাতে পারলেন না। ৪০ এর দুধের সর ৪৫, ২৪ এর আটা ২৬, ১৫ এর লাউ ২৫, ৮০ র মাজন ৮৪, ১০ এর পুজোর ফুল ১৫। ভারি বিব্রত তিনি, মিথ্যাচার করেন না নিজে, পছন্দও করেন না।

বাজার করে আর হেঁটে ফেরার ক্ষমতা নেই। ফেরার পথে ওষুধ কিনবেন বাড়ির কাছেই চারু ফার্মেসি থেকে। একটা রিক্সা চড়ে ওষুধের দোকানে নামলেন। রিক্সাওয়ালাকে গুনে গুনে ১২ টাকা দিলেন, আপশোস হচ্ছে এই টাকাটা ফালতুই গেল, হাতের ব্যাথা টা না থাকলে —

“আরো ২ টাকা দাদু। গত হপ্তা থেকে বেড়েছে, তুমি তো চড় না সেরকম তাই জানোনা”

“তা বাড়লো যে?”

“সব বাড়ছে, আমরা কি হাওয়া খাব?”

ভারি বিব্রত  ভুবন বাবু মাথা নাড়তে নাড়তে আরো ২ টাকা দিলেন। এই ১৪ টাকায় ১৫০ ডাল হয়ে যেত।

চারুর দোকানে ঢুকে বিষণ্ণ চিত্তে বললেন — “বাবা, ওষুধ গুলো দে।”

“এই নাও দাদু। তোমার আর দিদার আলাদা প্যাকেট। ৩৩০০ টাকা।”

ভারি চমকে উঠলেন ভুবনবাবু — ৩০০০ ছিলো তো গত মাসে!

“ডিসকাউন্ট বন্ধ দাদু,  জি-এস-টির জন্য। ওষুধ  পাচ্ছ এই অনেক।”

মাসিক ৩০০ টাকা অতিরিক্ত খরচায় বেজায়ে বিপন্ন হতে হবে তাঁকে। ব্যাথিত চিন্তিত তিনি পা বাড়ালেন রাস্তা পেরোতে।

“আরে দাদু, দেখে রাস্তা পেরোও” — প্রবল হর্ণে ঘাড় ঘুরিয়ে ভুবন বাবু দেখলেন একটা পেল্লাই ঝাঁ চকচকে কালো গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে রাজু প্রোমোটার। সানগ্লাসটা চোখ থেকে নামিয়ে এক ছ্যাবড়া লাল থুতু রাস্তায় ফেলে রাজু বলল — “বি এম ডাব্লিউ র ব্রেক বলে বেঁচে গেলে দাদু, নইলে পটল …”

“ভুল হয়ে গেছে বাবা, সত্যি ভাল গাড়ি!”

“খাসা দাদু। দুলাখ টাকা দাম কমেছে বলে নামিয়ে ফেললাম। এবার ফোটো রাস্তা থেকে।”

ভুবনবাবু একটু অবাক হয়ে তড়িঘড়ি রাস্তা পেরোলেন। ব্যাংকার মিথ্যে বলেনি তবে। বিদেশি গাড়ির দাম কমেছে বলে তিনি মাসিক ৭৫০ টাকা কম সুদ পেলেন। একটা কারণ তো পাওয়া গেল।

বাড়ির দরজায় বেল টিপতে কাজের লোক মায়া দরজা খুললো।

“এই যে দাদু এসে গেছ, তোমার জন্যই বসে আছি। ৬০০ এ আর বাসন মাজা আর হপ্তায় একদিন ঘর মোছা হবেনা। ৮০০ লাগবে নইলে গেলাম …”

ভুবন বাবু আর অবাক হলেন না। তিনি জেনে গেছেন কি ধরনের জিনিসের দাম কমেছে।

“তোকে ৮০০ ই দেব। কাজ টা কর মা” — বললেন ভুবনবাবু। তিনি পথ বাতলে ফেলেছেন। তার ওষুধ গুলো না খেলেও চলে পরের মাস থেকে। দেশের উন্নতির শরিক হতে পেরে দুদিন কম বাঁচলেও চলবে তার।

2 thoughts on “সস্তা

Leave a reply to all bangla newspaper Cancel reply