আজ জব চার্নকের প্রয়াণ দিবস। জব চার্নককে ঔপনিবেশিক ইতিহাসকারগণ কলকাতার প্রতিষ্ঠাতারূপে প্রচার করে থাকেন। ২০০৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট ঘোষণা করে যে তাকে প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণ্য করা উচিত নয়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলে বাসিন্দা ছিলো। হাইকোর্ট এই দাবিতে সঠিক ছিল যে যে গ্রামগুলি ঔপনিবেশিক কলকাতা গঠন করেছিল সেগুলি চার্নক বা ব্রিটিশ রাজ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে ভারতের পূর্ব সীমান্তে একটি ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির সীমান্ত স্থাপনের প্রতি চার্নকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা-চালিত চেষ্টা যা তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। নিসন্দেহে বর্তমান কলকাতা শহর সৃষ্টিতে তার একটি বিশাল ভূমিকা আছে।
জব চার্নকের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ইংল্যান্ডের ল্যাংকাশায়ারের বাসিন্দা। জব চার্নকের জন্ম ১৬৩১ সালে। জব চার্নক ১৬৫৬ সালে ভারতবর্ষে আসেন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে। জব চার্নক ১৬৯০ সালের ২৪শে আগস্ট হুগলী নদীর তীরে অবস্থিত জলাভূমি বেষ্টিত সুতানুটির নির্বাচিত জমিতে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স্হাপন করেন। সুতানুটিতে জাহাজ নোঙ্গর করা বেশ সুবিধাজনক ছিল, আর পাশাপাশি সমুদ্রগামী জাহাজসমূহও সরাসরি সুতানুটিতে পৌঁছাতে পারতো। তারপর গোবিন্দপুর আর কলকাতা গ্রাম মিলে ধীরে ধীরে তৈরি হল টাউন কলকাতা।
কোম্পনির ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য এই ইংরেজ হুগলী নদীর তীরে ১৬৯০ সালের ২৪শে আগস্ট যে কুঠি স্হাপন করেছিলেন, কালে কালে তা আজ এক সুবিশাল মেট্রোপলিটন সিটিতে পরিণত হয়েছে। জব চার্নক ভারতবর্ষ থেকে আর ইংল্যান্ডে ফিরে যাননি। জব চার্নক স্থানীয় একটি হিন্দু মেয়েকে বিবাহ করেন, যাকে তিনি সতীদাহের সময় চিতা হইতে উদ্ধার করেছিলেন। জব চার্নক তাকে বিবাহের পর নতুন নাম দেন মারিয়া। জব চার্নক স্ত্রীর প্রতি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, নিজ ধর্ম ত্যাগ করে স্ত্রীর ধর্ম গ্রহণ করে অখ্রিস্টান হয়ে যান।
জব চার্নক একসময় তার হিন্দু স্ত্রীকে নিয়ে কালীঘাটে মায়ের সমীপে পুজো দিতে আসেন। সত্যযুগে প্রজাপতি দক্ষ স্বগৃহে এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। সেই যজ্ঞে দেবতা, মুনি-ঋষি, যক্ষ, কিন্নর সকলকে নিমন্ত্রণ করলেও, দক্ষ আপন কন্যা সতী ও জামাতা শিবকে নিমন্ত্রণ জানাননি। সতী বিনা আমন্ত্রণে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলে, তাঁর সম্মুখেই যক্ষ শিবের নিন্দা করেন। পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে তৎক্ষণাৎ যজ্ঞকুণ্ডে আত্মবিসর্জন দেন সতী। তখন শিব ক্রুদ্ধ হয়ে সতীর শবদেহ স্কন্ধে নিয়ে বিশ্বধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করেন। তাঁকে শান্ত করতে বিশ্বপালক বিষ্ণু আপন সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে দেন। সতীর খণ্ডবিখণ্ড দেহের টুকরোগুলি পৃথিবীর নানা স্থানে পতিত হয়েছিল। পৃথিবীতে পড়ামাত্রই এগুলি প্রস্তরখণ্ডে পরিণত হয়। পীঠমালা তন্ত্র অনুযায়ী, সতীর ডান পায়ের চারটি আঙুল পড়েছিল কালীঘাটে।
জব চার্নক এক সময় নানা সমস্যায় জড়িয়ে বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমনকি সেই সময় এমনভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন যে, মনে মনে স্থির করেন আবার তিনি কলকাতা ছেড়ে ইংল্যান্ড ফিরে যাবেন। সেই সময় তার হিন্দু স্ত্রী তাকে পরামর্শ দেন যে এই কালীঘাটে অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালীর নিকট যদি মনে প্রানে কোন প্রার্থনা জানানো যায় তাহলে সকল অভিষ্ঠ সিদ্ধ হয়। এমনকি তিনি জব চার্নক কে এও বলেন যে সতীদাহের পূর্বে কালীমাতার নিকটে তিনি মনে প্রানে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। সেই কারণে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত হতে কালী মাতা তাকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু তার এমন দুর্ভাগ্য যে এখনো পর্যন্ত সেই কালীমাতার পুজো দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
স্ত্রীর কথা চিন্তা করে জব চার্নকের মনে হল কালী মাতার নিকট প্রার্থনা জানালে ক্ষতি কি ? সেইমতো মনে করলেন বটে তবে কিভাবে যে প্রার্থনা জানাবেন সেই জ্ঞান তো তাহার নেই ! তাই আর কোন ভাবেই প্রার্থনা জানানো হয়ে ওঠে না। শেষে একরাতে জব চার্নক স্বপ্ন দেখলেন এক বীভৎস মূর্তিতে দেবী কালী তাহার সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন, এবং বরাভয় দিয়ে জানালেন তুমি যেমন ভাবেই আমাকে স্মরণ কর তোমার যে আন্তরিকতা আছে আমি তাতেই খুশি হয়েছি। তুমি কালীঘাটে অর্থাৎ কালী ক্ষেত্রে গিয়ে পাঁঠা বলি দিয়ে আমায় পুজো দেবে তবেই তুমি সকল বিপদ হতে অচিরে মুক্তি লাভ করবে।

সেই রাত্রেই স্ত্রীকে জাগিয়ে কালীর চেহারার বর্ণনা দিয়ে জব চার্নক সকল কথাই জানালেন। তাহাতেই স্থির হইল পর দিবস প্রভাতে দুটি ছাগ নিয়ে কালীমাতার পূজা দেবার উদ্দেশ্যে কালীঘাটে উভয় অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী যাবেন। পরের দিন সকালে সবকিছু স্থির করেও মনে নতুন সংশয় জাগল। তিনি ভাবলেন তিনি তো হিন্দু নন ! যদি পান্ডারা তাকে পুজো দিতে না দেন ? তিনি মনে মনে স্থির করে নিলেন পান্ডারা বাধা দিতে আসলে তাদের হাতে পায়ে ধরে যেভাবেই হোক রাজী করিয়ে পুজো তিনি দেবেন।
তিনি মনে মনে সেই চিন্তা করে কালি ঘাটে পৌঁছে আশ্চর্য হয়ে গেলেন, অন্যরা যেন তার পুজোর জন্যই অপেক্ষা করে আছেন। পরে অবশ্য জানা গেল প্রধান সেবায়েত মায়ের স্বপ্ন আদেশ এ ওই পুজোর কথা জেনে অপেক্ষা করে আছেন। কারণ মায়ের আদেশ সর্বাগ্রে জব চার্নকের পুজো দিয়ে তারপর পুজো আরম্ভ হবে।
এমন ঘটনা সচরাচর ঘটে না। তাই এই সংবাদ পেয়ে বহুলোক পুজো দেখতে সমবেত হন। মহা সমারোহে জব চার্নকের পুজো হলো। পাঁঠা বলি ও হলো। পান্ডা জব চার্নকের কপালে রক্ত তিলক আঁকিয়ে দিলেন। তাহলে জব চার্নকের মানসিক পূজা কালী গ্রহণ করলেন। দুই বাহু তুলে মন্দির প্রাঙ্গণে জব চার্নক নৃত্য করতে লাগলেন। কালীমাতা যখন তাহার পূজা গ্রহণ করেছেন, তখন তাহার সকল কর্মই সফল হবে এ ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।
এরপর হতে বহুদিন পর্যন্ত লোকের ধারণা ছিল সবার আগে কোম্পানির পুজো না হলে অন্যের পুজো হবে না। কোম্পানি অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ইহার পর হতে কালী মূর্তি দর্শনের জন্য আর কারোর কোন বাধা রইল না। আজও সমগ্র বিশ্ব হতে বহু অহিন্দু কালীঘাটে এসে মায়ের পুজো দেন।
জব চার্নকের স্ত্রী মারিয়ার গর্ভে তাঁর চারটি কন্যার জন্ম হয়; বাংলায় বসবাসরত ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের বিবাহ হয়। ১৬৯৩ সালের ১০ই জানুয়ারী এই কলকাতা শহরেই জব চার্নকের মৃত্যু হয়। জব চার্নককে তার স্ত্রীর সমাধিক্ষেত্রেই সমাধিস্থ করা হয়। জব চার্নকের মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা ক্যাপ্টেন চার্লস আয়ারকে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার ১৬৯৮ সালের ১১ই নভেম্বর কলকাতা – সুতানুটি – গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটির প্রজাস্বত্ব ১৩০০ টাকায় একটি দলিলের দ্বারা দান করেন। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার এতদঞ্চলের জায়গিরদার ছিলেন। দলিলটি সই হয় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের আটচালা বাড়িতে যা আজও পর্যটকদের কাছে দর্শনীয়।

এই রূপ অজানা তথ্য জানাইয়া বিশেষ উপকার করিলেন কত্তা মহাশয়। ধন্যবাদ।
LikeLiked by 1 person
🙏🙏
LikeLike