সার্থক ডার্লিং

WhatsApp-এ এই গল্পটা পড়ে খুব ভালো লাগলো তাই এখানে প্রকাশিত করছি।

খাটের ওপর শুয়ে একমনে বইটা পড়ছিল পলা, দরজায় টোকা পড়তে বইটা রেখে, দরজাটা খুলে দেখে, অনিন্দিতা, ওর শাশুড়ীমা।

আমি একটু বেরোচ্ছি বৌমা। রূপা এলে দরজাটা খুলে দিও। পলা তাকিয়ে আছে শাশুড়ীর দিকে, একটা গমরঙা শাড়ি পরেছেন, কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ব্যাগ, আর আলগা করে হাতখোঁপা বেঁধেছেন — ব্যাস্ ওনার সাজ সম্পূর্ণ।

শাশুড়ী মানুষটাকে প্রথম থেকেই একটু অন্যরকম লেগেছিল পলার। বন্ধু বা আত্মীয়দের কাছ থেকে শাশুড়ী নামক ব্যক্তিটির যে সংজ্ঞা ও ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে, তার থেকে অনিন্দিতা অনেক আলাদা।

সাগ্নিকের সাথে ওর প্রেমের বিয়ে, কিন্তু কোন অমত ছিল না দুই বাড়ির। পলা এটা দেখেছে — ওদের বিয়েতে এবাড়ি থেকে সবচেয়ে বেশী  মতামত প্রাধান্য পেয়েছিল, দুই ননদ আর সাগ্নিকের।শাশুড়ীর সবেতেই কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব। শুধু একদিন উনি ফোন করে বলেছিলেনঃ সংসারের ভার সারাজীবন তোমাকে বইতে হবে পলা, তাই বলে নিজের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া গুলিকে কখনও বিসর্জন দিও না। শুনে খুব ভাল লেগেছিল পলার …

এবাড়িতে বউ হয়ে যেদিন ও প্রথম এল, দুই ননদ ওকে বলেছিলঃ এবার থেকে তুমিও মাকে একটু চোখে চোখে রেখো বৌদি। পলা কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। বধূবরণের দিন পলা নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল। শাশুড়ী এসে ওর হাতে দুটি বই উপহার দিয়েছিলেন — একটি আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতা আর অন্যটি মহাভারত। বলেছিলেনঃ  “সকলের সামনে দিলে, তার নিজের ছেলেমেয়েরাই হাসবে, তাই লুকিয়ে দিলাম তোমায়, পারলে পড়বে।” পলা শাশুড়ীকে প্রণাম করতে যেতে, উনি বাধা দেন। বলেনঃ “আগে আমাকে ভাল করে জান, তারপর ঘৃণা অথবা শ্রদ্ধা যেটা করা উচিৎ মনে করবে কোরো।”

সাগ্নিককে একথার মানে জানতে চেয়ে, কোন সদুত্তর পায়নি পলা। শুধু সাগ্নিক বলেছিল “মায়ের সব আদিখ্যেতা।”

এরপর অষ্টমঙ্গলা, দ্বিরাগমন, হানিমুন করে মাঝে কয়েকটা দিন কেটে গেছে, আজ একসপ্তাহ হল, ও এই বাড়িতে স্থিতু হয়েছে। তার মধ্যে একটাদিনও শাশুড়ীকে দুপুরে বাড়ি থাকতে দেখেনি ও। উনি ভীষণভাবে গুটিয়ে রাখেন নিজেকে। ওনার মনের নাগাল একখনও পায়নি পলা। আর মা -ছেলের সম্পর্কও খুব অস্বাভাবিক — কেউ কারো সাথে কথা বলেন না।

একদিন ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে পলার খুড়শাশুড়ী ওকে বলেনঃ “তোমার শাশুড়ী এখনো তার নাগরের সাথে দেখা করতে যায় বৌমা??” কথাটা চাবুকের মতো বিঁধেছিল পলাকে! কিন্তু এর উত্তর ও কারোর কাছে জানতে চায়নি।

কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। একদিন বন্ধুদের সাথে বইমেলায় গিয়ে পলা তার শাশুড়ীকে আবিষ্কার করে ওর অচেনা এক ভদ্রলোকের সাথে। দুজনেই বই দেখছেন, পলাকে দেখে উনি একটুও ইতঃস্তত বোধ না করে পরিচয় করিয়ে দেন,ঐ ভদ্রলোকের সাথে। “ও সুকল্যাণ, আমার কলেজ ফ্রেন্ড। বাকিটা তোমায় কালকে বলব পলা।”

দুপুরে পলাকে নিয়ে বেরোলেন অনিন্দিতা। গাড়ি থেকে যে বাড়িটার সামনে ওরা নেমেছিল — তার নাম ‘বলাকা’। সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে বাগান, একটা কাঠগোলাপের গাছ, আর কালো গেটের মাথায় লাল মাধবীলতা — অপূর্ব লাগছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন সুকল্যাণ। ওদেরকে ভিতরে নিয়ে যান উনি। বসার ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজানো। একটা রুচির ছাপ আছে সর্বত্র।

শুরু করেন অনিন্দিতা — “আমার কলেজের বন্ধু সুকল্যাণ। বহুবছর কোন যোগাযোগ ছিল না। আমার স্বামী মারা যাবার পর পেনশনের জন্য ব্যাঙ্কে গিয়ে আবার নতুন করে পরিচয় হয় ওর সাথে। ও ওই ব্রাঞ্চের ম্যানেজার ছিল, সেখান থেকে আবার বন্ধুত্ব। ওর স্ত্রী লিপিও আমাদের কমন ফ্রেন্ড ছিল। আস্তে আস্তে বন্ধু থেকে ও আমার অভিভাবক হয়ে ওঠে। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা থেকে শুরু করে সবেতেই ওর পরামর্শ ছাড়া চলত না আমার। লিপি, সুকল্যাণ আর আমার খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে, কিন্তু লিপি মারা যাওয়ার পর, আমার ছেলেমেয়েরা এই সম্পর্ককে অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। তারা কথায় কথায় অপমান করে আমাকে। কিন্তু এতদিন যার সাহায্যে ওদের বড় করে তুলেছি, তার দুর্দিনে তাকে ছেড়ে যাই কি করে। তাই ওদের অপমান সহ্য করেও আমি এই সম্পর্কটাকে ছেড়ে যাইনি। আর কোনকিছুর বিনিময়ে এই সম্পর্ককে আমি অস্বীকার করব না পলা। আজ তোমাকে বলতে বাধা নেই, আমি সুকল্যাণকে এখন ভালবাসি। এটা তুমি জানলে হয়ত, আমাকে ঘৃণা করার লিষ্টে আরেকজন সদস্য বাড়বে, কিন্তু আমাকে অপরের মুখে শুনে তুমি ঘৃণা কর আমি চাইনি … “

ওদের কথার মাঝে, সুকল্যাণ একটা হুইলচেয়ার নিয়ে ঘরে আসেন। তাতে বসে একজন বৃদ্ধা, বললেন — শুনলাম অনির বউ এসেছে, তাই দেখতে এলাম। পলা উঠে গিয়ে প্রনাম করে বৃদ্ধাকে।

আমার মা, সুকল্যাণ বলেন। আমার একমাত্র ছেলে বিদেশে, আমাকে নিয়ে যাবার জন্য অনেক বার বলেছে, কিন্তু আমি আমার মা কে ছেড়ে কোথায় যাব? তাই যাইনি। বৃদ্ধা বলেন — “এই দুটিতে মিলে আমায় একা থাকতে দেয় না, আমাকে নিয়ে ওরা বেড়াতে যায়। তোর বিয়েতে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওরা নিয়ে গেল না। আমি অনিকে একদিন না দেখে থাকতে পারি না, তাই রোজ আসে ও এখানে। এর জন্য অনিকে অনেক মাসুল গুনতে হয় আমি জানি … “

কারোর মুখে কোন কথা নেই, পলা আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে শাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরে বলে — “আজ থেকে তুমি আমার শাশুড়ীমা নও, আমার ডার্লিং, আমার বন্ধু। আর বন্ধুকে কেউ প্রণাম করে না। তোমার ছেলেমেয়েরা ভুল বুঝলেও আমি বুঝব না। আর কারোর কাছে নিজেকে নতুন করে প্রমান করার দরকার নেই তোমার। তুমি তোমার মতো থাকো। ছেলেমেয়েরা কখনোও বোঝার হলে নিজেরাই বুঝবে, তুমি যে মা ছাড়াও অন্য একটি মানুষ, সেটা বোঝে না। তোমার শারীরিক খোঁজ সবাই নেয়, কিন্তু মানসিক দিক থেকে কেমন আছ কেউ জানতে চায় না, সুতরাং কাউকে বোঝাবার দায় নেই তোমার। আমি সবার আগে একটা মেয়ে, তারপর তোমার বৌমা। একজন মেয়ে হয়ে আর একটা মেয়েকে উপলব্ধি করেছি আমি, তুমি সার্থক ডার্লিং।”

সবাই চুপ পলার কথা শুনে — এই মেয়েটা এত অকপট ভাবে বলবে, ওরা ভাবেননি কেউ। অনিন্দিতা আদর করেন পলাকে। আর পলা সুকল্যাণের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি কখনও বিদেশ যেয়ো না, তোমার মা, আর আমার ডার্লিংকে ছেড়ে। সুকল্যাণ মাথা নেড়ে সায় দেন, কারণ একরাশ দলা পাকানো কান্নায় তার গলা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে … ।


Discover more from Indrosphere

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply