ফেয়ারওয়েল

WhatsApp-এ এই গল্পটা পড়লাম। ভালো লাগলো, তাই এখানে শেয়ার করছি।

দক্ষিণ কলকাতার নামী এই রেঁস্তোরার এক কোনে আজ আনন্দমেলা। সাদা চুল আর ঘোলাটে চোখের বছর সত্তরের এক বৃদ্ধকে ঘিরে ওরা দশজন।অনন্যা শ্বেতা পঞ্চতপা অরণ্য দ্যুতি জয়িতা পিনাক দেবদূত রিমা আর অর্চ্চিস্মান। দামী জামা কাপড়ের মোড়কে বেমানান মানুষটি অবাক হয়ে দেখছে ওদের। ঝকঝকে চেহারার এই ছেলে মেয়েদের মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছেন ওই শান্ত আর দুষ্টু ছেলে মেয়েগুলোকে।

সেই কতবছর আগেকার কথা! রোজ সকালে বাচ্চা গুলোকে পেছনে বসিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। সাত সকালে ভ্যানের ভেতরে কেউ ঘুমিয়ে পড়ছে কেউ কাঁদছে কিন্তু ফেরার সময় আবার অন্যরূপ। বিচ্ছুগুলো কখনও মারামারি করছে কখনও ঝগড়া  কখনও ছোট্ট জানলা দিয়ে ঝুলে পড়ছে।রাস্তার লোকেরাও দেখতে পেয়ে কত শাসন করেছে ওদের। ওই দেবদূত ছেলেটা তোএকদিন মাথা ফাটিয়ে কি কান্ড। শেষ পর্যন্ত্য ব্যান্ডেজ করে বাড়ি পৌঁছে দিতে হল।ছোট্ট ফুলের মত জয়িতা ভ্যান রিক্সার মধ্যেই বড় হয়ে গেল একদিন। কত কষ্টে ওই বিচ্ছুগুলোর চোখ বাঁচিয়ে ওর মায়ের কাছে পৌঁছাতে হল। বৃষ্টির সময় ভেজার বায়না আর কড়া রোদে  ভ্যান ঠেলার জন্য কত যে বকাঝকা করতে হয়েছে ওদের! আর ওই দ্যুতি!ওর জন্মদিনে প্রতিবছর নেমন্তন্ন খেতেই হবে।ওই যে অনন্যা ওর বাবা তো প্রতিপূজোয় জামাকাপড় দেবেই।ভগবান  ওদের খুব ভালো করুন।ওই যে মেয়েটা শ্বেতা।  কি রোগাই না ছিল আগে। প্রথমে তো চিনতেই পারিনি। আর  অরণ্যতো কোনদিন ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠতে পারত না। এত দিন আগের সব যেন ছবির মতো ভাসছে আজ। ওদের পরেও তো প্রতিবছর কত বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছেছে এতদিন ধরে। সবাই কি তাকে মনে রেখেছে!!!

আইডিয়াটা দ্যুতির। ছোট্ট থেকেই বড় ভাবপ্রবন মেয়ে। সেদিন মেট্রো থেকে ফেরার সময় ভ্যানকাকুকে ঠিক চিনতে পেরেছে ও। গল্পেগল্পে ঠিক জেনে নিয়েছে ভ্যানকাকুর জীবন কথা। আগের ভ্যান আর নেই। স্ত্রীর মৃত্যুর সময় বিক্রি হয়ে গেছে। মেয়েরা  নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত।একটাই ছেলেকে একটু হাতের কাজ শিখিয়ে ছিল। সে কাজ শিখে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। আর আসেনা এখানে। তাই এই বুড়ো বয়সে রিক্সাটাকে ভাড়াদিয়ে নিজের কোনমতে চলে যায়। সেদিন  সারা রাত ভেবেছে দ্যুতি। তারপর একমাত্র অস্ত্র ফেস বুকে খুঁজেছে সবাইকে। ওদের সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব করতে ভালো লেগেছে।ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থনে উঠে এসেছে ভ্যানকাকুর কথা। দ্যুতির ভাবনার কথা শুনে  ওরাও যে এভাবে ওকে সাপোর্ট করবে ও ভাবতেই পারেনি।

সবাই মিলে  আলোচনা করে আয়োজন করেছে এই অনুষ্ঠানের। ওদের এই সান্ধ্য অনুষ্ঠানে ওরা আমন্ত্রণ জানিয়েছে আরও একজনকে। এক নাম না জানা দাদু। রোজ ওদের স্কুলে যাবার সময় হাত নেড়ে টা টা করত । পরে জেনেছিল উনি একজন রিটায়ার্ড জজ একদিন সকালে পথ জলে ভেসে যাচ্ছে। আগের দিন রাতে অঝোরে ঝরেছে আকাশ। সেদিন স্কুলে ছিল পরীক্ষা। দাদুর বাড়ির সামনে ভ্যান প্রায় উল্টে যাচ্ছিল। কাকু নিজের কথা না ভেবে কোনও মতে গাড়িটাকে সোজা রাখতে গিয়ে পড়ে যায় জলের মধ্যে। হাত পা কেটে গিয়ে সে কি অবস্থা!এই দাদু তখন ছুটে এসে কাকুর প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। এ জন্য ওদের পরীক্ষার সময়ের কোন অসুবিধে হয়নি। ঠিক সময়ে আবার বাড়িতে পৌঁছেও দেয় ওদের। বাড়ির লোকেরা জানতেও পারেনা। প্রতিটি পরীক্ষার রেজাল্ট শীট কাকুকে দেখাতেই হত সবার। কারো ভালো নম্বর দেখে কাকুর চোখে জল দেখেছিল দ্যুতি। তখনকার সেই আবেগকে ওরা বুঝতে পারেনি।কাকু বলেছিল সেই কোন ছেলেবেলায় পড়া ছেড়ে রিক্সা চালাতে আসতে হয়েছে। ছোটবেলায় বড় সখ ছিল পড়াশোনার। কেজানে সেই ভালোলাগা থেকেই বোধ হয় এই স্কুল ভ্যান চালানোর পরিকল্পনা।

গোল হয়ে বসে থাকা সবার মাঝে অরণ্য উঠে দাঁড়ায়। সঞ্চালকের ঢঙে বলতে থাকে ” নমস্কার । আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি একটা ছোট্ট কাজের জন্য। আমাদের ভ্যানকাকু যার নাম আমরা  জেনেছি এতবছর পরে সেই শ্রী পরান বারুইকে কিছু উপহার দিতে চাই। এই খামে আছে দু লক্ষ টাকার চেক।   অল্পদিনের চাকরীর সামান্য সঞ্চয় থেকে আমরা এইটুকুর ব্যবস্থা করেছি।   সামান্য টাকার বিনিময়ে  রোজ ঝড় জল উপেক্ষা করে যে ছিল  আমাদের শৈশবের সঙ্গী সেই ভ্যানকাকুর রিক্সাচালক জীবনের অবসরে আমাদের আন্তরিক উপহার। ” এই বলে খামটি দাদুর হাতে দেয়।  আজীবন দোষীদের শাস্তি দিতে দিতে মানুষের উপর  বিশ্বাস হারানো মানুষটি নির্বাক চেয়ে থাকে নতুন প্রজন্মের দিকে। আবার নতুনকরে বাঁচবার সাধ জাগে।ওই সত্তরোর্ধ মানুষটির চোখে নোনা জলের বন্যা । আনন্দের  না কান্নার!!! বাইরে গোধূলির  ম্লান আলো আর ঘরের ভেতরে দশটি মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় চকচক করছে দুই বৃদ্ধের জলেভরা চোখ। দশ জন তখন ভীষণ ব্যাস্ত কে দেবে আগে আপডেট্…….!!!!!


Discover more from Indrosphere

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply