কার্ফুর পুরানো স্মৃতি

সময়টা ছিলো ১৯৮৬-৮৯। আমি তখন ব্যাঙ্কে সদ্য অফিসার পদে নিযুক্ত হয়েছি। ট্রেনিং-এর সময় ভারতবর্ষের নানা শহরে ঘুরেছি বিভিন্ন বিভাগের ট্রেনিং-এর জন্য। এক বছর ট্রেনিঙের পরে পোস্টিং হয় উত্তর প্রদেশের আলীগড় শহরে ১৯৮৬ সনে। আমি ছিলাম শহরের প্রধান শাখায় ঋণ এবং বিদেশী বিনিময় বিভাগের ইনচার্জ। আলীগড় শহরটিকে দিল্লি-হাওড়া রেল লাইন প্রায় মাঝখান দিয়ে বিভক্ত করেছে। একদিকে মূল শহর এবং অন্যদিকে সিভিল লাইনস এবং বিখ্যাত আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়। আমার শাখা ছিল রেলওয়ে রোডে — শহরের দিকে এবং আমার নিবাস ছিল সিভিল লাইনস এলাকায়, টিকারাম মন্দিরের সমীপে সেন্টার পয়েন্ট মার্কেটের পাশে।

 আলীগড়ের বিশেষ খ্যাতি তালানগরী হিসেবে। তালাচাবি এখানে কুটির শিল্প থেকে শুরু করে বড় ফ্যাক্টরি সব আছে। আর এখানে তৈরি হয় পিতলের দরজা-জানালার কব্জা ইত্যাদি। সেইগুলো বিদেশে খুব এক্সপোর্ট হয়।এছাড়া একটি কুখ্যাতিও আছে এবং সেইটি হলো দাঙ্গা। স্বাধীনতার পর থেকে দাঙ্গা এবং কার্ফু আলীগড় শহরে জীবনের একটা অঙ্গ হয়ে গেছে যেন। তবে বেশীর ভাগ সময় দাঙ্গা এবং কার্ফু লাগতো শহরের দিকে।

আমাদের ব্যাঙ্কের কাজ, আমাকে অনেক সময় বাজারে ঘুরতে হতো, বিভিন্ন পরিবেশে, নানা পাড়ায় যেতে হতো — ঋণ, উসুল, এবং সিক্যুরিটি চেক করার জন্য। নানা জায়গায়, নানা সম্প্রদায়ের লোকেদের সাথে দেখাশোনা করতে হতো। সব মহলে এবং পাড়ায় কিছু ভালো চেনা-জানা লোক ছিল। বিপদে তারাই আমার সিক্যুরিটি বা একমাত্র ভরসা। চাকুরী জীবনের প্রথম থেকেই বিধাতা আমাকে বাস্তবিক জীবন এবং বিভিন্ন ঝুঁকির সাথে নিকট থেকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

যখন এই দাঙ্গার ভূমিকা রচনা হতো তখন বাজারে একটা অদ্ভুত থমথমে ভাব বোঝা যেতো, অথচ উপর-উপর সব যেন সামান্য প্রতীত হতো। সেটা এক বিশেষ অনুভূতি যা লিখে বর্নন করা যাবেনা। এই সময় কোন এক ক্ষুদ্র, সামান্য ঘটনাকে সূত্র করে লেগে যেতো দাঙ্গা যেটা কিনা আপাতদৃষ্টিতে নেহাতই নগণ্য বলে মনে হবে। এবং সামান্য দিনে সকলে ওই সব ঘটনাগুলিকে অবহেলা করে চলি এবং পাত্তা দিই না। অবশ্য দাঙ্গা শুরু হবার দিন পনেরো আগের থেকে আমরা আভাষ পেতাম যে এবার যে কোন দিন, যে কোন সময় দাঙ্গা লেগে যেতে পারে।

সেই সময় অবশ্য আমার এবং আমার বিশেষ নিকট বন্ধুতুল্য সহকর্মিদের টেনশনে কাটতো। বাড়িতে কেবল মা একা। আমরা কেউ কোনদিন তাকে এর আভাষ দিই নি। তিনি বৃথা চিন্তা করবেন।

আমি যখন কাজে ব্যাঙ্ক থেকে বাইরে যেতাম তখন ব্যাঙ্কের সেই বন্ধুদের বলে যেতাম যে আমি এক নির্দিস্ট সময়ের মধ্যে ফিরে আসবো, অন্যথা হলে পুলিশে খবর দিতে, এবং আমাকে খোঁজার চেষ্টা করতে। আমি সেই নির্দিস্ট সময়ের ১০-১৫ মিনিট পুর্বেই ফিরে আসতাম। আমাকে দেখে আমার বন্ধুদের মুখ দেখলেই বুঝতাম ওরা আমার ফেরার কতো অপেক্ষা করতো। থাক সেই কথা। সেই দিনগুলির চিন্তা করলে এখনো মাঝেমাঝে শিরদাঁড়ায় শিহিরণ অনুভব করি।

দিল্লীতে আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি বাড়িতে মাসকাবারি বাজার হতো সেই মাসের প্রয়োজন হিসেবে। এখানে এসে আমি শিখলাম এবং শুরু করলাম একমাসের আগের প্রয়োজন হিসেবে বাজার করতে। এক মাসের স্টক সব সময় বাড়িতে থাকতো। Risk mitigation। কার্ফু যখন-তখন লাগতে পারতো এবং লাগলে দুই সপ্তাহ তো বাইরের দরজা খোলা নিষেধ। তারপরে এক সপ্তাহ দিনে ঘণ্টার ছাড় যখন কিনা ডিম, পাউঁরুটি ইত্যাদি কিনতাম। তারপরে চতুর্থ  সপ্তাহের নাগাদ খুলতো চার-ঘন্টার জন্য। আর যখন বুঝতাম দাঙ্গার সম্ভাবনা আছে তখন মিল্ক-পাউডার কিনে রাখতাম চায়ের জন্য, আর কিনে রাখতাম আলু, পেঁয়াজ ইত্যাদি শুকনো সব্জি।

এই যখন চার-ঘন্টার জন্য ঢিল দিতো, সেই সময়ে আমরা ব্যাঙ্ক খুলতাম তিন ঘণ্টার জন্য। সেই সময় তো আর মোবাইল ছিলোনা যে আমরা প্লান করবো, কিন্তু একটা অলিখিত অভ্যাস অনুযায়ী আমরা সকলে পৌঁছে যেতাম ব্যাঙ্কে। প্রথম দিনে সর্ব প্রথমে কাজ হতো সেই কার্ফু লাগার দিনের অসমাপ্ত কাজগুলি শেষ করা, ব্যাঙ্কের ক্যাশ, দৈনিক হিসেব-খাতা মেলানো, ইত্যাদি। যখন কার্ফু লাগে তখন তো আর সময় থাকতো না, কোন প্রকারে ক্যাশ স্ট্রংরুমে ঢুকিয়ে, ব্যাঙ্কে তালা লাগিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া। পুলিশ প্রথম আধাঘণ্টা ব্যাঙ্কের লোকেদের এইজন্য ছাড় দিতো পথে।

কেবল আমরা ব্যাঙ্কের কর্মচারীগন নয়, আমাদের অনেক কাস্টমাররাও আসতো তাদের লেনদেন করার জন্য। অন্য সময়ে ব্যাঙ্কে কোনোদিন সম্পুর্ন উপস্থিতি হতো না, কেউ না কেউ নিশ্চিতই অবকাশে থাকতো। কিন্তু এই ৩/৪-ঘন্টার সময়ে ব্যাঙ্কে ১০০% উপস্থিতি হতো। এই প্রায় ৩-সপ্তাহের কার্ফুতে ঘরে বন্দী হয়ে সবাই যেন আমরা কাহিল হয়ে পড়তাম। ব্যাঙ্কে যেতে পেরে যেন স্বাধীনতার শ্বাস নিতাম।

১৯৮৯-৯১ আমার পোস্টিং হয়ে উত্তর প্রদেশের বাদায়ুঁ জেলায় এক গ্রামীণ শাখায় প্রবন্ধক পদে। আবার আমি ফিরে আসি আলীগড় শহরে ১৯৯১-এ। তারপরে ১৯৯৩ সনে আমার বদলী হয়ে যায় দিল্লী শহরে ব্যাঙ্কের প্রধান কার্যালয়ে।এর মাঝে ১৯৯২ সনে ডিসেম্বর মাসে আবার বিশাল কার্ফু লাগে। সেটা অবশ্য বাবরি মসজিদ নিয়ে, স্থানীয় দাঙ্গাকে প্রতিরোধ করার জন্য। তারপরে আর দাঙ্গা হয়নি আমার থাকা কালীন।

করোনাভাইরাস নিয়ে লকডাউনে ঘরে বন্দিপ্রায় জীবন আবার আমাকে সেই কার্ফুর দিনগুলির কথা মনে করিয়ে দিলো। মন যেন খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেবার জন্য ছটফট করছে। আবার মনের কোণায় একটু ভয়ও আছে যেন আমি সংক্রামিত না হয়ে যাই। এ যেন এক বিকট ধর্মসঙ্কট! আমরা প্রত্যেকে এখন কিংকর্তব্যবিমুঢ়।

ঈশ্বরের কাছে কামনা আমরা যেন সবাই সুস্থ থাকি এবং করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকি।

2 thoughts on “কার্ফুর পুরানো স্মৃতি

  1. Manojit Dasgupta's avatar Manojit Dasgupta

    খুব সুন্দর রচনা। দাঁঙ্গা আর করোনা দুটোই মারাত্মক। সুস্থ বাঁচাটাই আসল কাজ।

    Liked by 1 person

Leave a reply to Manojit Dasgupta Cancel reply