টেগোর হিল

গত ১৫ই নভেম্বর, ২০২১-এ ঝাড়খন্ড রাজ্যের ২১তম স্থাপনাদিবস ছিল। ১৬মাস পরে আবার রাঁচীর বাংলা সাংস্কৃতিক কর্মীবৃন্দ উদ্যোগে বাংলাভাষীরা ঝাড়খন্ডের ২১তম স্থাপনাবর্ষ প্রকৃতির সৌন্দর্যেভরা টেগোর হিলে উদযাপন করলেন।

ছবি সৌজন্যে: সুবীর লাহিড়ী

কলকাতা জোড়াসাাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্ভবত ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ছোটনাগপুর উপত্যকার রাঁচী শহরে বায়ুবদলের জন্য প্রথম এসেছিলেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, সম্পাদক এবং চিত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি তার ছোট ভাই, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভাকে প্রস্ফুটিত করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের বছরটা ছিল ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দ। সেই আন্দোলনে সামিল হতে বরিশালে গিয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপরে কলকাতায় ফিরে মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চৌরঙ্গীপাড়ার বাড়ীতে কিছুদিন থেকেই স্বাস্থোদ্ধারের জন্যে এসেছিলেন ছোটনাগপুরের পাহাড়, জঙ্গল,  ঝর্ণায় ঘেরা এই রাঁচী শহরে। তখন রাঁচী ছিল বাংলার অন্তর্গত। এখনে এসে তিনি প্রকৃতির প্রেমিক হয়ে, মোরাবাদী অঞ্চলে একটা পাহাড়ের ওপরে তৈরী ছোট বাড়ী কিনেই ফেলেছিলেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বসবাস শুরু করার আগে এটি ছিল ক্যাপ্টেন জে. আর. ওসলির বিশ্রামাগার। ১৮৪২ সালে, ক্যাপ্টেন ওসলি এই পাহাড়ে তার বিশ্রামাগার তৈরি করেন। ক্যাপ্টিয়ান ওসলি ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।

ক্যাপ্টেন ওসলি চলে যাওয়ার পর, ১৯০৮ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ না আসা পর্যন্ত জায়গাটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।

ঐতিহাসিকরা বলেন যে ঠাকুর পরিবারের খ্যাতি এবং সম্মান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্থানীয় জমিদার হরিহর সিং জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে এই প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু টিলা এবং এর প্রাঙ্গণ (১৭.৫ একর) দান করেন।

১১ ই ডিসেম্বর ১৯০৮ থেকে নির্মাণ কার্য্য শুরু হয়েছিল এবং ১৪ ই জুলাই ১৯১০ এর মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি পাহাড়ের উপর “ব্রহ্মস্থল” ও “শান্তিধাম” নির্মাণ করেছিলেন। শোনা যায় যে এই পাহাড়ে গভীর পাতকূঁয়া খননের জন্যে বেনারস থেকে সুদক্ষ কর্মীরা এসেছিলেন।

শ্রদ্ধেয় কবি এবং নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ১৯১২ সালে তার স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পর এখানে বসবাস স্থাপন করেন।

১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে রাঁচী নতুন রাজ্য বিহারের অন্তর্গত হয়েছিল। সেইবছরেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রাঁচী শহরে পাহাড়ের উপর তাঁর নতুন আবাস “শান্তিধামে” বসবাস করা শুরু করেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ১৯২৫ সালে শান্তিধামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সঙ্গীতরচনা ও সাহিত্যিক কর্মকান্ড ছাড়াও তিনি আশেপাশের গ্রামের (বোরিয়া, কাঁকে, হাতমা, ইত্যাদি) আদিবাসী ভাইবোনদের নিঃশুল্ক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। সেইসব পরিবারের শিশুদের নিঃশুল্ক পড়াশুনা শেখাতেন। স্থানীয় মানুষরা ভালোবেসে ওই পাহাড়টির নাম রেখে ছিলেন টেগোর হিল

টেগোর হিল-এর নিচে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বাগানবাড়ী ছিল। সেটার নাম ছিল “সত্যধাম।”

সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। ১৮৬৩ সালের জুন মাসে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি প্রায় ত্রিশ বছর আইসিএস-এ দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৮৯৭ সালে মহারাষ্ট্রের সাতারার বিচারক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি একজন লেখক, গানের সুরকার এবং ভাষাবিদ ছিলেন এবং ভারতীয় সমাজে নারীদের মুক্তির প্রতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

সত্যধাম এখন রামকৃষ্ণ মিশন এর আশ্রমের অন্তর্গত। রাঁচির মোরাবাদিতে অবস্থিত এই আশ্রমটি ১৯২৭ সালে শুরু হয়েছিল। আশ্রমটি রামকৃষ্ণ অর্ডারের অষ্টম রাষ্ট্রপতি স্বামী বিশুদ্ধানন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ইন্দিরাদেবী চৌধুরানী স্বয়ং রামকৃষ্ণ মিশনের মোরাবাদী আশ্রমের উদ্বোধনের দিনে উপস্থিত ছিলেন এবং উপনিষদের মন্ত্রপাঠ করেছিলেন। ইন্দিরা দেবী ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ সন্তান।

মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মেজোবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী ও তখন বালক বয়সের সুবীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য এই টেগোর হিল।

বর্তমানে ঝাড়খন্ড সরকরের পর্যটন বিভাগের রক্ষনাবেক্ষণে টেগোর হিল পুনরায় তার রুপ ফিরে পেয়েছে।

4 thoughts on “টেগোর হিল

Leave a reply to সঞ্চিতা ঘোষ Cancel reply