আজ থেকে ৩৮ বছর আগে আমার বাবা আমাদের ছেড়ে বৈকুণ্ঠধামে পাড়ি দিয়েছিলেন। এখনও মনে হয় যেন সেই দিনের কথা। আমি বাবাকে বাবুজি বলে ডাকতাম। বাবুজির কথা, কাজ, উদারতা, চিন্তাশীলতা এবং প্রজ্ঞা আজও আমাকে প্রভাবিত করে এবং অনুপ্রাণিত করে। তিনি তার পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং আরও অনেকের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আমি তাকে নিয়ে গর্বিত। আমি তাকে প্রায়ই স্মরণ করি।
আমি তখন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকরত। একদিন ভোর ৪.০০ টার নাগাদ আমার মা এবং আমি কিছু অদ্ভুত শব্দ শুনে জেগে উঠলাম এবং দেখতে পেলাম বাবুজি হাঁপাচ্ছেন। সাথে সাথে দৌড়ে ডাক্তার ডাকলাম। আমার মা বাবুজিকে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেছিলেন, কারণ আমরা অনুমান করেছিলাম যে তার অবস্থা দেখে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হবে। আমার এক মামাতো ভাই পিকলু তখন আমাদের সাথে থাকতো। পিকলু দিল্লিতে আর্কিটেকচারে ইন্টার্নশিপ করছিলো। সে জেগে উঠে তৎক্ষণাৎ একটা ট্যাক্সি ডাকতে দৌড় দিল।
ডাক্তার আমার সাথে সেই ভোরে বাসায় আসেন। তিনি বাবুজিকে পরীক্ষা করেন এবং পরামর্শ দেন যে আমরা তাকে অবিলম্বে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই কারণ এটি একটি করোনারি আক্রমণের ঘটনা। ততক্ষণে ট্যাক্সিও রেডি হয়ে আমাদের দরজায় অপেক্ষা করছে। আমি এবং আমাদের এক প্রতিবেশী দিলীপদার সাথে, যে আমাদের বাড়ি থেকে কিছু শব্দ শুনে জেগে উঠেছিল এবং দেখতে নেমে আসে, আমার বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। আমার মা আর পিকলু একটা আলাদা ট্যাক্সিতে আমাদের পিছনে এলেন।
ট্যাক্সির পিছনের সিটে আমার কোলে বাবুজির মাথা রাখা ছিল। হাসপাতালে যাওয়ার পথে ভোরবেলা রাস্তার আলোতে হঠাৎ দেখতে পেলাম তার চোখ স্থির। হৃদকম্পন যেন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আমি ইঙ্গিত পাই যে তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু, আমি নিজেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতে থাকি যে তিনি বেঁচে আছেন এবং ডাক্তাররা যখন তার চিকিৎসা শুরু করবেন হাসপাতালে পৌঁছানোর সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে। আমি তার জীবনের জন্য প্রার্থনা করতে লাগলাম। তিনি শ্বাস নিচ্ছেন কিনা তা পরীক্ষা করার শক্তি জোগাড় করতে পারলাম না।
পৌঁছাবার সাথে সাথে হাসপাতালের এমারজেন্সী বিভাগের ডাক্তার তাকে “মৃত” ঘোষণা করেছিলেন! আমার পৃথিবী যেন মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। কিন্তু, আমার মা এবং সবকিছু ব্যবস্থা করার জন্য আমাকে সকল কষ্ট চেপে শক্তি জোগাড় করতে হয়েছিল। ঈশ্বর নিশ্চয়ই আমাকে আমার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি দিয়েছেন। এটা আমার জন্য একটি খুব কঠিন পরিস্থিতি ছিল।
যেখানে আমার বাবাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই হাসপাতালে আমি জন্মগ্রহণ করি এইদিনের প্রায় 20 বছর আগে — নয়াদিল্লির সফদরজং হাসপাতাল।
ধীরে ধীরে পাড়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ল এবং বাবুজিকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর আমাদের বাড়িতে বেশ ভিড় একত্রিত হল। আমি এখনও আমাদের প্রতিবেশীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি কারণ তারা সেইদিন আমাদের সান্ত্বনা দেওয়ার, দুঃসময়য়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য, এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করার জন্য তাদের অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি এইরকম প্রতিবেশী থাকার জন্য এবং ওনারাই শেষকৃত্য ইত্যাদির সমস্ত ব্যবস্থা নিজেরাই করেছিলেন। ধন্যবাদ তাদের জন্য খুবই সামান্য শব্দ।
সেইদিন তারিখটি ছিল ৩০ নভেম্বর, ১৯৮৩।
আমি তোমাকে খুব মিস করি, বাবুজি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি ও শ্রদ্ধা করি।
পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতা জগতের আলো,
তার চোখ দিয়ে দেখেছি আমি মন্দ ভালো…

পীতৃ মাতৃ বিয়ওগ বড়ই কষ্টের সে যে বয়সেই হোক আ কেন। যেন মাথার উপর থেকে ছাদ সরিয়ে নেওয়ার মতন।
আশা করি মেশোমশাই যেখানেই আছেন খুবই আনন্দে আছেন পরমাত্মার হৃদয়।
ওম শান্তি। 🙏
ওঁ শান্তি! 🙏
বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন জানাই। 🙏🙏
ধন্যবাদ! 🙏