১৩ ডিসেম্বর, ১৯০৩—কলকাতার আকাশে সেদিন একটি নতুন তারা উঁকি দিয়েছিল। এ তারাটি শুধু আলোকিতই করেনি; হাসির ঝলকানিতে ভরিয়ে দিয়েছিল এক বিস্তীর্ণ আকাশ। বাংলা সাহিত্যের এক অমর প্রতিভা, শিবরাম চক্রবর্তী, এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হাস্যরসের অমিত শক্তি দিয়ে তিনি বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে এমন এক রঙের ছোঁয়া এনে দিয়েছিলেন যা আজও অক্ষুণ্ণ।
শিবরাম: হাস্যরসের শিল্পী
শিবরামের সৃষ্টির অন্যতম বিশেষত্ব ছিল তাঁর দৈনন্দিন ঘটনাকে হাস্যরসে রূপান্তর করার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি জানতেন কীভাবে সাধারণকে অসাধারণ করে তুলতে হয়। তাঁর গল্পের চরিত্র, যেমন হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধন, কিংবা ছোট ছোট উপাখ্যান, প্রতিটিই ছিল সমাজের তীব্র পর্যবেক্ষণের ফল। কিন্তু তাঁর উপস্থাপনার ভঙ্গিতে কখনোই তিক্ততা আসেনি। বরং, মিষ্টি রসিকতার মোড়কে তিনি সমাজের গভীর সত্য প্রকাশ করতেন।
তার সম্পর্কে অনেক উপাখ্যানের মধ্যে, একটি দাঁড়িয়ে আছে – তার বাতিক এবং অপ্রীতিকর আত্মার প্রতিফলন। কথিত আছে যে তার জন্মদিনের এক দিনে, তিনি একটি উদযাপনের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু তার কাছে টাকা ছিল না। নিরুৎসাহিত, শিবরাম, তার স্বাক্ষর হাস্যরসের সাথে, পার্টির ব্যবস্থা করার জন্য তার বেশ কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নেন। তিনি শুধুমাত্র তার মনোমুগ্ধকর এবং বুদ্ধি দিয়ে সবাইকে বিনোদন দেননি, তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে পার্টিটি স্মরণীয় ছিল। পরে, যখন তার বন্ধুরা তাদের টাকা ফেরত চেয়েছিল, তখন সে ব্যঙ্গ করে বলেছিল, “আপনি খেয়েছেন এবং ভোজ উপভোগ করেছেন। আমি কেন টাকা ফেরত দেব? এমন একটি আনন্দদায়ক সমাবেশের আয়োজন করার জন্য আপনার আমাকে অর্থ প্রদান করা উচিত!”
এই উপাখ্যানটি শিবরামের সারমর্মকে ধারণ করে—অনায়াসে যেকোনো পরিস্থিতিকে লালিত গল্পে পরিণত করে, তার জীবন নিজেই হাসির উদযাপন।
গল্পে গল্পে জীবন
শিবরামের জীবন ছিল এক চলমান কাহিনি। তাঁর গল্পগুলো যেন রাস্তাঘাট, ফুটপাথ, কিংবা চায়ের দোকান থেকে তুলে আনা। শীতের কুয়াশায় মোড়া এক সকাল। কলকাতার পুরনো রাস্তা ধরে শিবরাম চক্রবর্তী আর চণ্ডী লাহিড়ী ধীর পায়ে হাঁটছেন। চারদিকে পাখির ডাক, আর গলির মোড়ে চায়ের দোকানগুলোর হাঁকডাক যেন শহরটাকে এক বিশেষ জীবন্ত রূপ দিয়েছে। শিবরামের গায়ে পুরনো ধুতি-পাঞ্জাবি আর চণ্ডীর হাতে ছোট্ট নোটবুক। তারা কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলেছেন।
শিবরাম একটু রহস্যময় ভঙ্গিতে বললেন, “চণ্ডী, জানিস! গতকাল একটা গোপন গবেষণা করেছি।”
চণ্ডী কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “গোপন গবেষণা মানে?”
শিবরাম স্মিত হেসে উত্তর দিলেন, “খুব গোপন! আমার টেবিলের চারপাশে বসে থাকা মশাগুলোকে একটা ছড়া শুনিয়েছিলাম।”
চণ্ডী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর?”
“তিনটে মশা হাততালি দিয়ে উড়ে গেল আর একটা মশা মাথা নিচু করে বসে রইল,” শিবরাম বললেন।
চণ্ডী হাসতে হাসতে বললেন, “সে তো তোর কবিতার গভীরতা বুঝতে পারেনি!”
শিবরাম গম্ভীর মুখে বললেন, “না চণ্ডী, সে কবিতার শোকে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। মশা হলেও, শিল্প বোঝে!”
চণ্ডী তখন হাসিতে বেঁকে পড়ার উপক্রম। বললেন, “তুই না শিবরাম, একদিন মানুষকে হাসতে হাসতে পাগল করে দিবি!”
মাংসের ঘুগনির গল্প
শিবরামের গল্পে খাদ্যের প্রতি ভালোবাসার ছাপ স্পষ্ট। এই আলাপচারিতার মাঝেই শিবরামের নজর পড়ল রাস্তার এক কোণে ছোট্ট দোকানের দিকে। দোকানের সামনে বাঁশের ছাউনি, আর স্টিলের কড়াইতে ফুটতে থাকা মাংসের ঘুগনির মন মাতানো গন্ধ। সাইনবোর্ডে লেখা, “মাংসের ঘুগনি পাওয়া যায়।”
শিবরাম থেমে গেলেন। বললেন, “চণ্ডী, এই ঘুগনির গন্ধে আমার ক্ষিদে চট করে বেড়ে গেল। চল, একটু চেখে দেখি।”
চণ্ডী মুচকি হেসে বললেন, “রাস্তায় যা কিছু ভালো গন্ধ বেরোয়, তুই তাই চেখে দেখতে চাস!”
শিবরাম দোকানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “তিন প্লেট দাও তো হে।”
দোকানি অবাক হয়ে বলল, “তিন প্লেট? দুজন তো!”
শিবরাম মুচকি হেসে বললেন, “তিন প্লেট। একটা আমি খাব, একটা চণ্ডী খাবে, আর একটা তুমি খাবে।”
দোকানি অবাক হয়ে বলল, “আমি?”
“হ্যাঁ রে ভাই। এত ভালো ঘুগনি বানাও, নিজে খেয়ে দেখেছো কোনোদিন? খেয়ে দেখো, কী অপূর্ব তোমার হাত!”
চণ্ডী পাশ থেকে বললেন, “কি রে শিবরাম, শিল্পীকে তার নিজের শিল্পের স্বাদ চেখে দেখানোর মিশনে বেরিয়েছিস নাকি?”
শিবরাম হেসে বললেন, “চণ্ডী, ঘুগনি তো শুধু খাবার নয়, এটা শিল্প! যে বানায়, তারও তো জানা দরকার সে কী বানিয়েছে!”
দোকানি প্রথমে দ্বিধায় ছিল। কিন্তু শিবরামের আন্তরিকতায় গলে গেল। নিজের জন্য একটা প্লেট তুলে নিল। মুখে প্রথম চামচটা যেতেই তার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। বলল, “বাবা রে! সত্যিই ভালো বানাই তো!”
শিবরাম মুচকি হেসে বললেন, “একটা কথা মনে রাখিস ভাই, নিজের হাতের কাজ নিজে না দেখলে বা না চাখলে বুঝবি কী করে সেটা কতটা ভালো?”
চণ্ডী হেসে বললেন, “শিবরাম, তুই শুধু লেখক না দার্শনিকের মতো কথা বলছিস আজ!”
শিবরাম বললেন, “চণ্ডী, এটাই তো জীবন। হাসো, খাও, আর নিজের হাতের কাজ নিয়ে গর্ব করো।”
শিবরামের জন্মদিনের মধুর গল্প
দোকানদারের চোখে তখন এক বিন্দু জল। চণ্ডী আর শিবরাম হেসে রাস্তায় আবার হাঁটা শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে শিবরাম বললেন, “চণ্ডী জানিস, আজ আমার জন্মদিন। তাই এমন মানুষদের আনন্দ দিতে চাই, যারা অন্যদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে।”
চণ্ডী চুপ করে রইলেন। শিবরামের কথার গভীরতা তাকে মুগ্ধ করল। মাথা নেড়ে বললেন, “তুই না শিবরাম! সত্যিকারের বড় মনের মানুষ।”
এক অমর হাসি
১৯৮০ সালে শিবরাম চক্রবর্তী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টিরা আজও বেঁচে আছে। তাঁর লেখা শুধুমাত্র আমাদের হাসায় না; তা আমাদের জীবনকে সহজভাবে দেখার শিক্ষাও দেয়। তাঁর গল্প পড়লে মনে হয়, খুশি ছড়ানোর জন্য বড় কিছু করতে হয় না। ছোট্ট একটি রসিকতাও পারে জীবনের কঠিন মুহূর্তকে সুন্দর করে তুলতে।
আজ, শিবরামের জন্মদিনে আমরা তাঁকে স্মরণ করি তাঁর সৃষ্টির জাদুর জন্য। আসুন, তাঁর গল্প পড়ি, হাসি ভাগ করে নিই, আর তাঁর জীবনদর্শন থেকে শিখি। শিবরামের মতো করে যদি আমরা জীবনকে উদযাপন করতে পারি, তবে তাঁর প্রতি সেটাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
শিবরাম চক্রবর্তী শুধুই একজন লেখক নন। জীবনের প্রতিটি ছোট মুহূর্তে হাসি আর আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার এক আশ্চর্য প্রতিভা তার মধ্যে। তাঁর সহজ গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খুশি ছড়ানোর জন্য বড় কিছু করতে হয় না। এই প্রবাদপ্রতিম মানুষটির একশো একুশতম জন্মদিনে রইল আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা।

বাড়ি থেকে পালিয়ে, আমি যে কতবার পড়েছি তার ইয়াত্তা নেই। অসাধারণ লেখক ছিলেন। 🙏
LikeLiked by 1 person
সত্য, শরৎচন্দ্রের পর মানুষের কাছে জনপ্রিয় গল্পের জন্য তিনি একজন সত্যিকারের কিংবদন্তি।
LikeLike