খান আব্দুল গাফফার খান ও শান্তিনিকেতনের অমলিন স্মৃতি

ইতিহাসের পাতা ঘাঁটতে গেলে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা আমাদের ভাবায়, অনুপ্রাণিত করে, আবার কখনো বিষাদের সুরও ছুঁয়ে যায়। খান আব্দুল গাফফার খান এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষাৎ ঠিক এমনই এক স্মরণীয় অধ্যায়, যা আমাদের জাতির সাংস্কৃতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে সমৃদ্ধ করেছে। সীমান্ত গান্ধী নামে খ্যাত গাফফার খানের শান্তিনিকেতন সফর কেবলই একটি ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়, এটি ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের এক অনন্য পর্ব।

প্রথম সাক্ষাৎ: ১৯৩৪ সালের সেই দিন

১৯৩৪ সালের ৩১ আগস্ট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুর স্টেশনে উপস্থিত হয়েছিলেন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই। যাত্রীদের মনে প্রশ্ন, কবিগুরু কি শান্তিনিকেতন ছেড়ে কোথাও চলে যাচ্ছেন? কিন্তু স্টেশনে তখন কলকাতা যাবার কোনো ট্রেন ছিল না। কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষার পর দেখা গেল, বর্ধমান দিক থেকে একটি ট্রেন এসে থামল। সেই ট্রেনের একটি তৃতীয় শ্রেণির কামরা থেকে নেমে এলেন এক দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ পাঠান। তাঁকে দেখে ৭৩ বছরের রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেলেন এবং ৪৪ বছর বয়স্ক গাফফার খানকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

সেদিনের সেই অতিথি ছিলেন খান আব্দুল গাফফার খান, যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার আদর্শকে তিনি সীমান্ত অঞ্চলে প্রসারিত করেছিলেন এবং নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের সেবায়।

শান্তিনিকেতন সফরের পটভূমি

গাফফার খান, যিনি ধর্মনিরপেক্ষ মানবিকতা ও অহিংসার মন্ত্রে বিশ্বাস করতেন, শান্তিনিকেতনের কথা শুনেছিলেন মহাত্মা গান্ধীর কাছে। তাঁর পুত্র আব্দুল গনিকে শান্তিনিকেতনে পাঠানোর মধ্য দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সেতুবন্ধ রচিত হয়। পেশোয়ার থেকে হাজারিবাগ জেল মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর আন্তরিক ইচ্ছা ছিল শান্তিনিকেতন পরিদর্শনের এবং কবিগুরুর সঙ্গে সাক্ষাতের। পাটনায় বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে একটি বার্তা পাঠান। শান্তিনিকেতন থেকে সম্মতি পাওয়ার পরই তাঁর যাত্রা শুরু হয়।

রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা ও গাফফার খানের অনুভূতি

গাফফার খানকে স্টেশন থেকে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গেলেন বিশ্বভারতীর লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে। সেখানে সমবেত আশ্রমিক, ছাত্রছাত্রী ও অন্যান্যদের সামনে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কবিগুরু বললেন, গাফফার খানের মতো একজন মহৎ ব্যক্তিত্বের সফর আশ্রমের জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা। তিনি যখন কারান্তরালে বন্দি ছিলেন, তখনও তাঁর পুত্রকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছিলেন, যা তাঁর গভীর আস্থা ও মমত্ববোধের পরিচায়ক।

পরবর্তী দিন সকালে কবি উদয়ন প্রাঙ্গণে গাফফার খানের সম্মানে একটি সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে বাংলা হরফে লেখা ভাষণটি রবীন্দ্রনাথ উর্দুতে পাঠ করেছিলেন। ভাষণে তিনি বলেন,

“আপনি আমাদের মধ্যে অল্পক্ষণের জন্যে এসেছেন। কিন্তু এই সৌভাগ্যকে আমি অল্প বলে মনে করিনি। আপনার দর্শন আমাদের হৃদয়ের মধ্যে নতুন শক্তি সঞ্চার করেছে। প্রেমের শিক্ষা মুখে বললে নয়, যারা প্রকৃত প্রেমিক, তাঁদের সান্নিধ্যেই তা উপলব্ধি করা যায়।”

গাফফার খান সেদিন তাঁর উত্তরে বলেন,

“গুরুদেবের স্নেহ ও আন্তরিকতায় আমি অভিভূত। এখানে এসে আমি যা দেখলাম, তা আমার কল্পনার থেকেও মহৎ। রবীন্দ্রনাথের আদর্শ ভারতবর্ষকে উন্নতির পথে নিয়ে যাবে।”

৩৫ বছর পরের পুনর্মিলন

১৯৬৯ সালে, গান্ধীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতে এসে গাফফার খান শান্তিনিকেতন সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ৩৫ বছর পর আবারও তিনি সেই পরিচিত স্থানে ফিরে আসেন, যেখানে তাঁর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের স্নেহ ও ভালবাসা।

১৪ ডিসেম্বর রাতে একটি তৃতীয় শ্রেণির কোচ তাঁকে নিয়ে আসে বোলপুর স্টেশনে। পরদিন সকালে তাঁকে উদয়নের সেই ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ৩৫ বছর আগে তিনি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে একদিন কাটিয়েছিলেন। তিনি ঘুরে দেখেন কলাভবন, বিচিত্রা এবং শ্রীনিকেতন। বিচিত্রায় তাঁর পুত্র আব্দুল গনির হাতে গড়া কাঠের খোদাই মূর্তি দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

এক বুক আক্ষেপ ও শান্তির খোঁজ

শ্রীনিকেতন সফরের পর তিনি ভুবনডাঙ্গার সাঁওতাল পল্লীতে যান। সাঁওতালদের জীবনযাত্রা দেখে তিনি জানতে চান, স্বাধীনতার পরে তাঁদের জীবনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না। সাঁওতালদের জীবনযাত্রায় উন্নতির অভাব দেখে তাঁর মুখের হাসি ম্লান হয়ে যায়। গুরুদেবের আদর্শ এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন সাঁওতালদের জীবনে সেভাবে পরিবর্তন আনতে পারেনি।

তবু শান্তিনিকেতন সফর তাঁর কাছে ছিল এক টুকরো শান্তি। গুরুদেবের স্মৃতির কাছে বারবার ফিরে গিয়ে তিনি নিজের শক্তি ও প্রেরণা খুঁজে নিয়েছিলেন।

শেষের দিনগুলি

গাফফার খান জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছিলেন আফগানিস্তানের জালালাবাদে। রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির আদর্শকে বুকে ধারণ করে তিনি ১৯৮৮ সালের ২০ জানুয়ারি প্রয়াত হন। তাঁর শান্তিনিকেতন সফর এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি আজও আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

শেষ কথা

খান আব্দুল গাফফার খান ইতিহাসের সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম, যাঁর জীবন মানবিক মূল্যবোধ এবং সার্বজনীন প্রেমের এক অসামান্য উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন এবং তাঁর সঙ্গে এই বন্ধন মানবিকতা ও অহিংসার এক নতুন সংজ্ঞা তুলে ধরে।

শান্তিনিকেতনে তাঁর প্রথম এবং দ্বিতীয় সফরের স্মৃতিগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সৃষ্টিশীল ও মানবিকতার চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা। গাফফার খানের জীবনের এই অধ্যায় আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করবে।


কৃতজ্ঞতা স্বীকার: লেখাটি রচনার জন্য “White Politics”-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

4 thoughts on “খান আব্দুল গাফফার খান ও শান্তিনিকেতনের অমলিন স্মৃতি

Leave a reply to Aranyascope Cancel reply