সেই যে, সেই তখন…।
যখন ভরদুপুরে অহেতুক নীচের তলায় উঁকি দিয়ে ‘‘এই আজ কী রাঁধলে গো বৌদি?’’ জাতীয় কৌতূহলকে ‘এ মা, কী গায়ে পড়া!’ বলা হতো না…। যখন শেয়ার শব্দটা শুধু ব্যবসার বাজারেই ছিল। পরস্পরকে সুখ-দুঃখের কথা বলাকে তো ভাগাভাগি বলা হতো…। যখন অলিগলি এজমালি বাড়ির প্রতিটা বাসিন্দার পরিচয় ‘ভাড়াটে’ হওয়া সত্ত্বেও সবাই সবার খবর রাখতেন…। যখন রাঁধতে রাঁধতে হঠাৎ আদা ফুরিয়ে গেলে দোকানে ছুটতে হতো না, পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে নেওয়া যেত সহজ ভাবে…। যখন বিকেল শব্দের মানে ছিল মাঠ-দাপানো, কোচিং-কাঁপানো নয়..।
তখন দীপাবলি হতো…। উজ্জ্বল আলোর আনন্দে মাখো মাখো উৎসবের রাত্তির। দিওয়ালি আর ধনতেরাসের বাজারি হুজুগ তখনও গিলে নেয়নি আনন্দ শব্দের মানে। তখন এই আলো-সন্ধে আসার দিন সাতেক আগে থেকেই ছাদভরে ওলোট-পালোট রোদ্দুর খেত চাঁপাহাটির চর্কি, তুবড়ি, ফুলঝুরি, রংমশালের দল…। রকেট, প্যারাশ্যুটরা তখন বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চ মাতিয়ে যেত কেবল…। তখন শুভেচ্ছা জানাতে প্রদীপের থালা হাতে নিয়ে ছবি তুলে ট্যাগ করার চল ছিল না…। নিজের আনন্দের সঙ্গে অন্যকে যদি ট্যাগিয়ে নিতেই হতো, তা হলে সটান এসে হাতে ফুলঝুরি ধরিয়ে দিয়ে কোলাকুলি করে নিতে হতো…। তখন দূষণ ছিল না, আলো ছিল কেবল…। তখন, সেই তখন মোম-প্রদীপ-সলতের নরম আলোর আঁচে উৎসব নেমে আসত সন্ধের পায়ে পায়ে। সেই সন্ধেয় বারান্দাদের নাম রাখাই যেতো দীপান্বিতা। তখন, সেই হাফ-সোয়েটারের হিম সন্ধেটায় আলোয় আলোয় পুড়ে যেত অনেক অবসাদ…। সঙ্গে পুড়ত কিছু মোমবাতিও। পুড়ত মাটির প্রদীপ। পুড়তে পুড়তে শেষ হয়ে যেত মোম…। কালো হয়ে যেত মাটির প্রদীপ…।মাটির মতো দেখতে খয়েরি ফাইবারের চ্যাটালো খোলের মুখে এক বিন্দু টুনি ছুঁইয়ে দেওয়ার আশ্চর্য কেরামতি তখনও গ্রাস করে ফেলেনি এই পুড়ে যাওয়াটুকু…।
সেই আলো-সন্ধেরা জ্বলতে জ্বলতে, পুড়তে পুড়তে, গলতে গলতে কবেই বড় করে দিয়েছে শহরজোড়া নাইন্টিজ় চিলড্রেনদের…। কবেই তো সেই রঙিন ফানুসের ঝাঁক উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছে তাদের সমস্ত অকারণ অবসর…। তাদের ছড়ে যাওয়া কনুই-হাঁটুতে কবেই পড়েছে ম্যাচিওরিটির মলম…। তারা এখন অফিসের ঠান্ডা ঘরে বসে কাচের জানলার এ পার থেকে শহরের আলো-আকাশ দেখে মা-কে হোয়াটসঅ্যাপ করে, “টুনির সুইচটা অন করেছো…?” তাদের দীপাবলি পেরিয়ে যায় গাদাগাদা ‘হ্যাপি দিওয়ালি’-র বন্যায়…।
ক্যালেন্ডার ওল্টালে দিনগুলো খুব পেছনে নয়, কিন্তু স্মৃতি হাতড়ালে যেন পূর্বজন্ম…। সেই পূর্বজন্মের সমস্ত আলোটুকু চোখে মেখে দিনভর ভুলে থাকার অভ্যাস করাটাই পাল্টে যাওয়ার আর এক নাম…।
আর তুমি তো জানোই, জীবন মানেই পাল্টে যাওয়া…।
Discover more from Indrosphere
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন-ছুঁয়ে যাওয়া… 🙂
Very nice, Thanks for sharing this with us.