জীবনের কিছু ঘটনা তখন যতটা বিরক্তিকর মনে হয়, বহু বছর পরে ফিরে তাকালে ঠিক ততটাই গল্প হয়ে যায়। আমার ১৯৯১ সালের বিয়েটাও তেমনই এক গল্প। সেখানে দাঙ্গা আছে, কার্ফু আছে, ভারত বন্ধ আছে, স্টেশনের রিটায়ারিং রুম আছে, আর আছে অনেক অচেনা-চেনা মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা। আজ ভাবি, সবকিছু যদি পরিকল্পনামাফিক হতো, তাহলে হয়তো এই গল্পের জন্মই হতো না।
সেই গল্প শুরু করতে হলে আমাকে ফিরে যেতে হবে ১৯৮৫ সালে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিতে শুরু করেছিলাম। ভাগ্য সহায় ছিল—প্রথম সুযোগেই একটি সরকারি ব্যাঙ্কে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে নির্বাচিত হলাম। ১৯৮৫ সালে চাকরিতে যোগ দিলাম। এক বছরের প্রবেশনারি প্রশিক্ষণ শেষ করে ১৯৮৬ সালে আমার পোস্টিং হলো উত্তর প্রদেশের আলীগড় শহরের মেইন ব্রাঞ্চে।
তখন আমার বয়স কম, উৎসাহ অনেক, আর পৃথিবীকে জানার আগ্রহ তারও বেশি। বুঝতেই পারিনি, আলীগড় শুধু আমার কর্মজীবনের প্রথম অধ্যায়ই হবে না, আমার জীবনের বহু স্মরণীয় ঘটনারও নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে।
আজকের প্রজন্মের কাছে আলীগড় মানেই হয়তো তালা শিল্প কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আশির দশকের শেষের আলীগড়ের আর-একটি পরিচয় ছিল—দাঙ্গা। বছরে অন্তত একবার দাঙ্গা হবেই, এমন একটা অলিখিত নিয়ম যেন ছিল। দাঙ্গা মানেই কার্ফু, আর কার্ফু মানেই অন্তত দুই সপ্তাহের অবরুদ্ধ জীবন।
প্রদেশ সরকার শহরের বিভিন্ন ল্যাম্পপোস্টে মাইক বসিয়ে রেখেছিল। পুলিশের গাড়ি নিয়ে ঘোষণা করতে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই বোধহয় এই ব্যবস্থা। আমি আর কোথাও এমন ব্যবস্থা দেখিনি। হয়তো অন্য কোথাও এত ঘনঘন দাঙ্গাও হতো না।
একবার কার্ফু জারি হলে প্রথমে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। তারপর ধীরে ধীরে দু’ঘণ্টা, চার ঘণ্টা করে ছাড় মিলত। এমনও সময় গেছে, বাড়ির সামনের দরজায় দাঁড়ানো পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। শুনেছিলাম, একবার অর্ধসামরিক বাহিনীর ফ্ল্যাগ মার্চ চলাকালীন পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির গাড়ির ওপর গুলি চলেছিল। তারপর থেকেই প্রশাসন আর কোনও ঝুঁকি নিতে চাইত না।
এই কারণেই আলীগড়ের মানুষের জীবনযাত্রাও ছিল অন্যরকম। পৃথিবীর অন্য শহরে মানুষ মাসের বাজার করে এক মাসের জন্য। আলীগড়ে মানুষ বাজার করত যেন পরের মাসের জন্যও। কারণ কেউ জানত না, আগামীকাল সকালেও বাজার খোলা থাকবে, না কার্ফুর সাইরেন বেজে উঠবে। তাই প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই অন্তত এক মাসের চাল, ডাল, আটা, তেল, নুন, ওষুধ—সবসময় মজুত থাকত।
আলীগড়ের আর-একটি অদ্ভুত অথচ মানবিক প্রথা ছিল। কোনও বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য হোটেল বা হল বুক করলে অগ্রিম টাকা দিতে হতো ঠিকই, কিন্তু যদি দাঙ্গা বা কার্ফুর কারণে অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যেত, তাহলে সেই অগ্রিম সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়া হতো। বিষয়টি কোনও সরকারি নিয়ম ছিল না, কিন্তু শহরের অধিকাংশ হোটেল ও অনুষ্ঠানস্থল এই অলিখিত সামাজিক দায়িত্ব পালন করত। দাঙ্গাপ্রবণ শহরের মানুষ সম্ভবত অনিশ্চয়তার সঙ্গে বাঁচতে বাঁচতেই এই মানবিক রীতির জন্ম দিয়েছিল।
এইভাবেই দেখতে দেখতে কয়েক বছর কেটে গেল। অফিস, নতুন শহর, নতুন মানুষ আর মায়ের সঙ্গে ছোট্ট সংসার—জীবন ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ খুঁজে নিল।
কলেজে পড়াকালীন বাবাকে হারিয়েছিলাম। চাকরি পাওয়ার পর মা আমার সঙ্গে আলীগড়ে এসে থাকতে শুরু করেন। বাঙালি পরিবার সেখানে হাতে গোনা। তবু মা-ছেলের সংসার বেশ ভালোই চলছিল।
১৯৯১ সালে মা একদিন বললেন, “এবার সংসারে আর একজনকে নিয়ে আসার সময় হয়েছে।”
আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত বারাণসীর এক মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হলো। অগ্রহায়ণ মাসে বিয়ে, আর বৌভাত হবে আলীগড়ে।
সব পরিকল্পনা সম্পূর্ণ।
কিন্তু দুর্গাপূজার পর থেকেই শহরের বাতাস অন্য কথা বলতে শুরু করল। চায়ের দোকান, অফিস, বাজার—সবখানেই একটাই আলোচনা, “কালিপুজোর পর দাঙ্গা হবেই।”
আমি তাই আগে থেকেই বৌভাতের জন্য বুক করা হোটেলে গিয়ে আবার নিশ্চিত হয়ে এলাম। যদি কার্ফুর জন্য অনুষ্ঠান বাতিল হয়, তাহলে অগ্রিম টাকা ফেরত পাব তো? হোটেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিন্ত করলেন—”সেটা নিয়ে ভাববেন না।”
অগ্রহায়ণ মাসে বিয়ের মরশুম। আগে থেকে বুকিং না করলে আর জায়গা পাওয়া যেত না। তাই ঝুঁকি নিয়েও বুকিং রাখতে হয়েছিল।
কিন্তু ভাগ্য মানুষের হিসাব মানে না। দাঙ্গা লাগল ঠিকই, তবে আলীগড়ে নয়—বারাণসীতে। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরে আমার বিয়ে।
সব নিমন্ত্রণ শেষ। কেনাকাটা শেষ। বাড়িভাড়া, ক্যাটারিং, আলো, সাজসজ্জা—সব প্রস্তুত। স্বাভাবিকভাবেই আমার হবু শ্বশুরমশাই গভীর চিন্তায় পড়লেন।
ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানালেন, যদি শহরের বদলে সারনাথে তাঁর ভাইয়ের বাড়ি থেকে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়, আমাদের কোনও আপত্তি আছে কি না। কারণ কার্ফুর মধ্যে বরযাত্রীদের জন্য যে বিশাল আয়োজন করেছিলেন, তা আর সম্ভব নয়।
মা শুধু বলেছিলেন, “বিয়ে যেন ভালোভাবে হয়। বাকিটা নিয়ে আপনি ভাববেন না।”
শেষ পর্যন্ত বাবা বিশ্বনাথের আশীর্বাদে আর তথাগত বুদ্ধের স্মৃতিধন্য সারনাথে আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হলো। তবে শ্বশুরমশাইকে কম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। তিনি সরকারি চাকরি করতেন। সহকর্মীরা সহযোগিতা করেছিলেন। সরকারি গাড়ি আর কার্ফু পাস থাকায় অনেক কাজই সম্ভব হয়েছিল।
আমি অবশ্য তখনও চিন্তায় ছিলাম আলীগড়ের বৌভাত নিয়ে। আমার সহকর্মীরাই সব দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছিল।
ভাবলাম, এবার বুঝি সব ঝামেলা শেষ। কিন্তু আসল গল্প তখনও বাকি।
অষ্টমঙ্গলার জন্য স্ত্রীকে নিয়ে আবার বারাণসী যাচ্ছি। এর মধ্যে দিনের কার্ফু উঠে গেছে, শুধু রাতের কার্ফু চলছে।
সকালে আলীগড় স্টেশনে পৌঁছে দেখি এক অদ্ভুত দৃশ্য। দিল্লি থেকে আসা সব ট্রেন অনির্দিষ্টকালের জন্য দেরি। হাওড়া থেকে আসা ট্রেনগুলোরও একই অবস্থা। শুধু বোর্ডে লেখা—পূর্বা এক্সপ্রেস ঠিক সময়ে আসছে।
বিষয়টা আমার কৌতূহল জাগাল। স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি হেসে বললেন, —”স্যার, ওটা আজকের ট্রেন নয়। গতকালের ট্রেন। চব্বিশ ঘণ্টা লেট। গতকাল ভারত বন্ধ ছিল।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, ভারত বন্ধ দেশের সর্বত্র সফল হোক বা না হোক, পশ্চিমবঙ্গে তার প্রভাব পড়বেই।
আমি মনে মনে ভাবলাম, ভারত বন্ধ দেশের সর্বত্র সফল হোক বা না হোক, পশ্চিমবঙ্গে তার প্রভাব পড়বেই।
অষ্টমঙ্গলা বাতিল করা যায় না। তাই যা ট্রেন পেলাম, তাতেই উঠে পড়লাম। দিল্লি থেকে আসা এক ট্রেনে কানপুর পর্যন্ত। প্রথম শ্রেণিতে বসেছিলাম বটে, কিন্তু টিকিট ছিল অন্য ট্রেনের। এত ভিড়ের মধ্যে টিকিট পরীক্ষকের আর আসার উপায় কোথায়!
কানপুর থেকে আবার অন্য ট্রেন ধরে মুঘলসরাই। রাত প্রায় এগারোটায় পৌঁছলাম।
শ্বশুরমশাই আমাদের নিতে আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি জানবেন কী করে আমরা কোন ট্রেনে এলাম? মোবাইল ফোন তখনও মানুষের জীবনে আসেনি।
মুঘলসরাইয়ের এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্ত পর্যন্ত খুঁজেও তাঁকে পেলাম না। এদিকে রাতের কার্ফু শুরু হয়ে গেছে। শহরে যাওয়ার উপায় নেই।
শেষ পর্যন্ত এক কুলিকে কিছু টাকা দিয়ে স্টেশনের রিটায়ারিং রুমে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করলাম।
ভাবুন তো, পৃথিবীতে কত মানুষ পাঁচতারা হোটেলে, পাহাড়ে, সমুদ্রে মধুচন্দ্রিমা কাটায়। আর আমাদের মধুচন্দ্রিমার প্রথম রাত কাটল মুঘলসরাই স্টেশনের রিটায়ারিং রুমে! আজও ভাবলে হাসি পায়। পৃথিবীতে আর কেউ হয়তো স্টেশনের রিটায়ারিং রুমকে মধুচন্দ্রিমার স্মৃতি হিসেবে বয়ে বেড়াচ্ছেন না।
পরদিন সকালে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে জানতে পারলাম, শ্বশুরমশাই সারা রাত স্টেশনেই অপেক্ষা করেছিলেন। আমরা কোন প্ল্যাটফর্মে আছি, তিনি জানেন না; আমরা জানি না তিনি কোথায়।
শেষ পর্যন্ত লোক পাঠিয়ে তাঁকে স্টেশন থেকে বাড়ি আনা হলো।
অষ্টমঙ্গলার এক রাত স্টেশনে কেটে গেলেও, তারপর আর বিশেষ কোনও বিপত্তি হয়নি। সময়মতো আলীগড়ে ফিরে এলাম।
আজ এত বছর পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, বিয়েটা শুধু একটি সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল না। দাঙ্গা, কার্ফু, অনিশ্চয়তা, মানুষের সহযোগিতা, প্রশাসনের কঠোরতা, আত্মীয়তার উষ্ণতা—সব মিলিয়ে সেটি ছিল এক সময়ের দলিল। আর আমার ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত ভ্রমণকাহিনি।
সময় অনেক কিছু মুছে দেয়, কিন্তু সব স্মৃতি মুছে দেয় না। কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমার ১৯৯১ সালের বিয়েটা তেমনই—যেখানে বিপত্তি ছিল, বিভ্রাট ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছিল মানুষের আন্তরিকতার।
আজ তাই মনে হয়, ওটা শুধু আমার বিবাহ ছিল না; ওটা ছিল এক সময়ের ভারতবর্ষের গল্প।
Discover more from Indrosphere
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

“ভারত বন্ধ কোথাও সফল হউক না হউক পশ্চিম বঙ্গে তো হবেই।” এক্কেবারে ঠিক… 😀 😀
🙂 🙂
এই গপ্পোটা তো মনে হচ্ছে তোর আত্মকাহিনী !!!
😁😁😁
😁😁😁
Exciting ghotona ata apnake mantei hobe.. life r koto rokom experience.. akhon apni Iraq a ..Ai niye kichu likhun pls..apnar post theke onek kichu Jana jache new Iraq r
Really it is a very engrossing incident. Truth is always stranger than fiction. A lifetime incident.
Pingback: The Wedding That History Interrupted – Indrosphere