অতীত মন্থন | বিবাহ না যেন একটা বিভ্রাট!

ইন্দ্রজিৎ এক সরকারি ব্যাঙ্কে প্রবেশনারি অফিসারের চাকুরী পেয়েছে। তার এক বছর ট্রেনিঙের পরে পোস্টিং হয়েছে উত্তর প্রদেশের আলীগড় শহরের মেন ব্রাঞ্চে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার সাথে সাথেই চাকুরীটা পেয়ে যায়। ফাইনাল ইয়ারে থাকতেই পরীক্ষা দিতে শুরু করে ছিলো এবং প্রথম সুযোগেই ইন্দ্রজিৎ চাকুরীটা পেয়ে যায়।

সময়টা হল আশির দশকের শেষের দিকে। আর সেই সময়ে আলীগড় শহরে প্রায়ই দাঙ্গা, কার্ফু লেগেই থাকতো। ফি বছর একবার তো হবেই। দাঙ্গা এবং কার্ফু বেশী লাগার জন্য প্রদেশ সরকার একটু দূরে দূরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে মাইক লাগিয়ে রেখেছিল। পুলিশের গাড়ী ঘুরে ঘুরে ঘোষণা করার সময় বা ঝুঁকি থেকে বেঁচে যাবে। এইরকম ব্যবস্থা আর কোন শহরে বোধহয় নেই। অবশ্য এতো দাঙ্গাতো আর সব জায়গায় হয় না। একবার কার্ফু লাগলে অন্তত দুই সপ্তাহ থাকবেই। তারপরে ধীরে ধীরে দুই ঘণ্টা, চার ঘণ্টা করে কার্ফু সরানো হতো।

সাধারণত মানুষেরা যখন মাসের বাজার করে, তারা কেবল সেই মাসের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করে। কিন্তু আলীগড়ে লোকেরা এক মাস আগের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করতো। মানে বাড়ীতে সবসময় একমাসের পণ্যসামগ্রী জমা থাকতো। কেউ বোলতে পারেবে না কখন দাঙ্গা লাগবে, আর তারপরেই কার্ফু। আলীগড়ে কার্ফুতে আবার বেশী কড়াকড়ি। একবার অর্ধসামরিক বলের ফ্ল্যাগমার্চের সময় DGPর গাড়ীর উপরে গুলি চালিয়েছিল। তারপর থেকে কড়াকড়িটা একটু বেশী। বাড়ির সামনের দরজায় পর্যন্ত দাঁড়াতে দিতো না। সেই জন্য মানুষেরা এক মাসের প্রয়োজনীয় বস্তুর স্টক বাড়ীতে সব সময় রেখে দিতো।

আলীগড়ের আরেকটা বিশেষত্ব ছিল, সেটা হল কোন বিবাহ, জন্মদিন ইত্যাদি হেতু হোটেল, বা হল বুক করতে যে অগ্রিম জমা করতে হতো সেটা হোটেল বা হল মালিক ফেরৎ করে দিতো যদি কার্ফুর জন্য অনুষ্ঠান না হতে পারে।

কলেজে পড়াকালীন ইন্দ্রজিতের বাবা মারা যান। ইন্দ্রজিতের সাথে তার মা চলে আসেন আলীগড় শহরে। আলীগড় শহরে বাঙালী সমাজ বলতে মাত্র গুটিকয়েক পরিবার। যাই হউক মা-ছেলে বেশ দুইজনে থাকছিল আলীগড়ে। এতদিনে দশক ঘুরে ৯০র দশক শুরু হয়ে গিয়েছে। ছেলে ভালো চাকুরী করে, তাই মায়ের কাছে নানা আত্মীয়-স্বজনদের কাছথেকে ছেলের বিবাহের প্রস্তাব আসতো। শেষে ইন্দ্রজিতের বিবাহ ঠিক হয় বারাণসির এক মেয়ের সাথে। অগ্রহায়ণ মাস উত্তম মাস, তাই বিবাহের দিন ঠিক হল অগ্রহায়ণ মাসে। বিবাহ হইবে বারাণসি শহরে। বৌভাত হইবে আলীগড় শহরে। সব ঠিক হয়ে গেলো।

দুর্গাপূজার পর থেকেই দাঙ্গার বাজার সগরম হয়ে উঠছে। বোঝা যাচ্ছে, কালিপুজার পরে দাঙ্গা লাগবে। যেই হোটেলে পার্টির ব্যবস্থা করেছে সেই হোটেলে ইন্দ্রজিৎ আবার গিয়ে নিশ্চিত করে এলো, যদি কোন কারণে অনুষ্ঠান না হতে পারে তাহলে অগ্রিমটা ফেরৎ পাবে কিনা। অগ্রহায়ণ মাসে প্রচুর বিবাহ হয়, তাই আগের থেকে অগ্রিম না দিয়ে বুক করে না রাখলে আর কোন জায়গা পাওয়া যাবে না।

কিন্তু এবার দাঙ্গা লাগলো বারাণসি শহরে। বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগে। সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে, নিমন্ত্রণ আদি সব কাজ শেষ। কেনা কাটা সব সম্পূর্ণ। বিয়ে বাড়ির ব্যবস্থা বিশাল। ইন্দ্রজিতের শ্বশুর মহাশয় স্বাভাবিকই চিন্তায় পরে গেলেন কি হবে? ইন্দ্রজিতের মায়ের সাথে ফোনে কথা বললেন। উনি জানালেন যে ওনার ভাই পাশে সারনাথে থাকে সেখান থেকে যদি বিবাহ করা হয়, তাহলে কোন আপত্তি আছে কিনা? আর যেহেতু কার্ফু শহরে, বরযাত্রীদের জন্য যে বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন সেইরকম এখন আর সম্ভব নয়। ইন্দ্রজিতের মা জানিয়েদিলেন তাকে সেই নিয়ে কোন চিন্তা না করতে, তিনি কেবল বিয়েটা যাতে ভালভাবে হয়ে তার ব্যবস্থা করতে।

বাবা বিশ্বনাথের আশীর্বাদে কার্ফুর মধ্যে বিবাহ ভালভাবেই সুসম্পন্ন হয় যেখানে গৌতম বুদ্ধ প্রথম ধর্মের শিক্ষা দেন। যদিও ইন্দ্রজিতের শশুরমহাশয়কে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। উনি সরকারি চাকুরী করতেন, ওনার সহকর্মীরা খুব সাহায্য করেন। আর সরকারি গাড়ী থাকাতে কার্ফুর মধ্যে যাতায়াত করতে কিছুটা সুবিধা হয়ে যায়। কার্ফুর পাস জোগাড় হয়ে যায়।

ইন্দ্রজিৎ যা নিয়ে চিন্তা করছিলো আলীগড়ের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সেটা আর তখন হয়নি। আলীগড়ের সকল অনুষ্ঠান ইন্দ্রজিতের সহকর্মীরা সামলে নেয়। সব কাজ ভালভাবে সম্পন্ন হয়। গল্প এখানেই শেষ নয়।

এবার ইন্দ্রজিৎ সস্ত্রীক যাচ্ছে বারাণসি অষ্টমঙ্গলার রীতি সম্পূর্ণ করতে। ইতিমধ্যে দিনের কার্ফু উঠে গিয়েছে, শহরে কেবল নাইট কার্ফু। সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় অব্দি। ইন্দ্রজিতের শশুরমহাশয় মেয়ে-জামাইয়ের ট্রেনের টিকেট আগেই কেটে রেখেছিলেন। ইন্দ্রজিৎরা সকাল আটটার সময় আলীগড় স্টেশনে পৌঁছালো ট্রেন ধরবে বলে। ওদের ট্রেনের সময় সাড়ে আটটায়। স্টেশনে পৌঁছে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে দিল্লী থেকে সব ট্রেন নিলম্বিত বা অনিশ্চিতকালীন দেরীতে চলছে। হাওড়া থেকে যে ট্রেন গুলো আসছে সব ২০ ঘটা, ২৫ ঘণ্টা নয়তো অনিশ্চিত কালীন লেট। খালি বোর্ডে দেখাচ্ছে পূর্বা এক্সপ্রেস হাওড়া থেকে আসছে ঠিক সময় মতো! অদ্ভুত ব্যাপার। ইন্দ্রজিৎ নিজের কৌতূহল চাপতে পারলো না, স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞাসা করলো এর কি কারণ? স্টেশন মাস্টার মুচকি হেসে বললেন, “স্যার গত কালের ট্রেনটা আজকে আসছে, ২৪ ঘণ্টা লেট। গতকাল ভারত বন্ধ ছিল বলে এই দুরবস্থা।” ভারত বন্ধ কোথাও সফল হউক না হউক পশ্চিম বঙ্গে তো হবেই।

অষ্টমঙ্গলা করতে তো যেতেই হবে, কি করা যায়, সেই ভাবছে দুইজনে। সকাল ১০টার নাগাদ দিল্লী থেকে একটা ট্রেন এলো। বিশাল ভিড়। ট্রেনটা কানপুর হয়ে লখনউ চলে যাবে। ইন্দ্রজিৎরা ফার্স্ট ক্লাসে উঠে বসলো। এতো ভিড়ে কে আর আসবে টিকেট চেক করতে? টিকেট তো আছে তবে অন্য ট্রেনের। কোন রকমে একটু জায়গা জোগাড় করে বসেই বসেই দুইজনে শেষে পৌঁছায় কানপুর স্টেশনে। ট্রেনটা অন্যদিকে ঘুরে যাবে, তাই ইন্দ্রজিৎরা নেমে পড়লো কানপুরে। আবার অন্য ট্রেন ধরে যাবে মুঘলসরাই। আবার স্টেশনে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করার পরে পেলো একটা ট্রেন, সেইটায় চড়ে রওনা হল মুঘলসরাইএর উদ্দেশে।

ট্রেনটা যখন মুঘলসরাই এসে পৌঁছায় তখন বাজে রাত্রে এগারোটা। ইন্দ্রজিতের শ্বশুরমহাশয়ের কথা ছিল মেয়ে-জামাইকে স্টেশনে রিসিভ করার। কিন্তু উনি তো জানেননা কোন ট্রেনে ইন্দ্রজিৎ সস্ত্রীক পৌঁছাচ্ছে। উনি বোধহয় অন্য প্লাটফর্মে দেখছেন। মুঘলসরাই বড়ো জাঙ্কশন। ইন্দ্রজিৎরা প্লাটফর্মে পুরো ঘুরে ওনাকে দেখতে পেলোনা। শহরে রাত্রকালীন কার্ফু। সকাল না হলে বাড়ী যাওয়া যাবে না। ইন্দ্রজিৎ একটা কুলিকে ধরে, কিছু টাকা দিয়ে, রাত্রের জন্য স্টেশনে একটা রিটায়ারিং রুমের ব্যবস্থা করলো। রাতটা রিটায়রিং রুমে কাটিয়ে পরের দিন সকাল হলে ইন্দ্রজিৎরা যায় বাড়ীতে। বোলতে গেলে ইন্দ্রজিৎদের মধুচন্দ্রিমা কাটলো মুঘলসরাই স্টেশনের রিটায়রিং রুমে! এইরকম মধুচন্দ্রিমা পৃথিবীতে বিরল। আমার তো মনে হয়না আর কেউ স্টেশনের রিটায়রিং রুমে মধুচন্দ্রিমার কথা স্বপ্নেও ভেবে থাকবে।

বাড়ীতে গিয়ে জানতে পারলো যে ইন্দ্রজিতের শশুরমহাশয় সারা রাত স্টেশনে কাটিয়েছেন, আর তখনো অপেক্ষা করছেন তার মেয়ে-জামাইয়ের। তখন তো আর মোবাইল ছিলনা, আবার লোক পাঠানো হোল ওনাকে স্টেশন থেকে নিয়ে আসবার জন্য।

অষ্টমঙ্গলার এক রাত তো কেটে গেলো স্টেশনে। তারপরে আর অবশ্য বিশেষ কিছু ঝামেলা হয়নি। ইন্দ্রজিৎরা সময় মতো ফিরে এসেছিলো আলীগড়ে। সত্যি এই বিবাহ মনে থাকবে সকলের। বিবাহ না যেন একটা বিভ্রাট!

6 thoughts on “অতীত মন্থন | বিবাহ না যেন একটা বিভ্রাট!

  1. Samya's avatar Samya

    Exciting ghotona ata apnake mantei hobe.. life r koto rokom experience.. akhon apni Iraq a ..Ai niye kichu likhun pls..apnar post theke onek kichu Jana jache new Iraq r

    Liked by 1 person

Leave a reply to Maniparna Sengupta Majumder Cancel reply